অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ২য় অংশ]

Submitted by administrator on Tue, 04/24/2012 - 18:29

প্রশ্ন:- (৮) কীভাবে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয় ?

উত্তর:- ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার তাসখন্দে ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা হলেও ভারতে ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে ওঠেনি । এই উদ্দেশ্যে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে কানপুরে একটি সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । এই সন্মেলনে বিশিষ্ঠ কমিউনিস্ট নেতা সিঙ্গায়াভেলু চেট্টিয়ার -এর সভাপতিত্বে ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’প্রতিষ্ঠীত হয় ।

প্রশ্ন:- (৯) কংগ্রেসের সমাজতন্ত্রী দলের উদ্ভব কীভাবে হয় ? এই দলের কয়েকজন নেতার নাম করো । সুভাষচন্দ্র বসু জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন কেন ?

উত্তর:- কংগ্রেসে সমাজতন্ত্রী দলের উদ্ভবের কারণগুলির মধ্যে নিম্নলিখিত কারণগুলি উল্লেখ করা যেতে পারে । বিংশ শতকের তিরিশের দশকে জাতীয় কংগ্রেসে

(ক) রুশ বিপ্লবের প্রভাব এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রাধান্য,

(খ) শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের দুঃখদুর্দশায় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের উদাসীনতা,

(গ) কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রভাব,

(ঘ) সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী সুভাষচন্দ্র বসু ও জহরলাল নেহেরুর প্রভাব প্রভৃতি কারণে কংগ্রেসের মধ্যে একটি বাম মনোভাবাপন্ন গোষ্ঠির আত্মপ্রকাশ ঘটে । এই সময় ১৯৩৯ সালের মে মাসে মহাত্মা গান্ধির মতাদর্শের বিরোধী ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী কংগ্রেসের কিছু যুবক সদস্যদের উদ্যোগে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের উদ্ভব হয় ।

কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের কয়েকজন নেতা হলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, আচার্য নরেন্দ্রদেব, রামমনোহর লোহিয়া, অচ্যুত পটবর্ধন, ইউসুফ মেহেরালি প্রভৃতি ।

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের হরিপুরা অধিবেশনে গান্ধিজির সঙ্গে মতপার্থক্য এবং পরের বছর জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশনে গান্ধিজির অসহযোগিতার কারণে সুভাষচন্দ্র বসু জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন ।

প্রশ্ন:- (১০) সুভাষচন্দ্রের বামপন্থী মানসিকতা সম্পর্কে কী জান ? কোন পরিস্থিতিতে সুভাষচন্দ্র বাংলা কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে বহিষ্কৃত হন ?

উত্তর:- বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে জাতীয় কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে বামপন্থী ঝোঁক প্রকট হয়ে ওঠে । কংগ্রেসে বামপন্থী প্রবণতার দু’জন প্রতীক-পুরুষ ছিলেন জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু । তাঁরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তি অর্জনের জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি জাতীয় আন্দোলনকে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষপাতি ছিলেন । সে জন্য সুভাষ চন্দ্র বসু ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে লাহোর কংগ্রেসের অধিবেশনে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষকদের নিয়ে এক সমান্তরাল সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন ।

সুভাষ চন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহেরু প্রমুখ নবীন নেতারা জাতীয় আন্দোলনের মধ্যে সংগ্রামী চেতনা বৃদ্ধি করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা যেমন শুধুমাত্র রাজনৈতিক মুক্তিকে অর্থাৎ বিদেশি শাসনের অবসান ঘটানোকে চরম লক্ষ বলে মনে করেন নি, তেমনি একই সঙ্গে তাঁরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ঘটানো প্রয়োজনীয় কর্তব্য বলে মনে করে ছিলেন । এই সময়ে কংগ্রেসের মধ্যে একটি বামপন্থী মনোভাবাপন্ন গোষ্ঠির আত্মপ্রকাশ ঘটে । নেহেরু ও সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ।

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে সুভাষ চন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন । তারপর কংগ্রেস দলের মধ্যেই ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করেন । সুভাষ চন্দ্র বসু চেয়েছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লক কংগ্রেসের ভেতরের ও বাইরের বামপন্থী শক্তি গুলিকে সুসংহত করে একটি সংগ্রামী মঞ্চে পরিণত করা । এ জন্য তিনি ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ফরওয়ার্ড ব্লক ও কয়েকটি বামপন্থী গোষ্ঠীকে নিয়ে বামপন্থী সমন্বয় কমিটি গঠন করেন ।

এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সুভাষ চন্দ্রের বিরদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনেন ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে বাংলা কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কৃত করা হয় এবং তিন বছরের জন্য কংগ্রেসের কোনো পদ গ্রহণের অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হয় । সুভাষ চন্দ্র বসুর আধিপত্য হ্রাস করার জন্য বঙ্গীয় কংগ্রেস কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।

প্রশ্ন:- (১১) ভারতের স্বাধিনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মাতঙ্গিনী হাজরার অবদান আলোচনা করো ।

উত্তর:- ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মাতঙ্গিনী হাজরার অবদান বিশেষভাবে স্মরনীয় ।

(ক) মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন গান্ধিজির অনুরাগী একজন ৭৩ বছরের গ্রাম্য বিধবা মহিলা ।

(খ) ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধি যখন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দেন তখন তিনি এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন । তিনিও তাঁর সহযোগী রামচন্দ্র বেরা তমলুক আদালত ও থানা অবরোধের সিদ্ধান্ত নেন । এই উদ্দেশ্যে ২৯ সেপ্টেম্বর তাঁরা প্রায় ২০,০০০ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তমলুক থানা ও আদালত ঘেরাও করেন । এই অবরোধকালে পুলিশ গুলি চালালে মাতঙ্গিনী হাজরা সহ অনেকেই মারা যান । মাতঙ্গিনী হাজরার দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের আদর্শ জাতিকে উদ্বুদ্ধ করে ।

প্রশ্ন:- (১৩) পুণা চুক্তি কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ? পুণা চুক্তির (১৯৩২ খ্রি.) শর্ত কী ছিল ?

উত্তর:- ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে তফশিলী নেতা ডঃ বি. আর. আম্বেদকার ও মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে পুণা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ।

পুণা চুক্তির শর্তাবলি:- পুণা চুক্তির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করা যায়নি, বরং এক অর্থে তা আরও তীব্র হয়েছিল। এই জন্যই সুভাষচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, জওহরলাল নেহেরু প্রমুখ নেতারা গান্ধিজির কড়া সমালোচনা করেছিলেন । বস্তুত একটি গৌণ বিষয়কে মুখ্য করে তুলে গান্ধিজি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষতি করেছিলেন ।

প্রশ্ন:- (১৪) স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রীপ্‌স কী উদ্দেশ্যে ভারতে আসেন? তাঁর প্রস্তাবগুলি কী ছিল ? তাঁর ব্যর্থতার কারণ কী ?

উত্তর:- স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রীপস-এর ভারতে আসার উদ্দেশ্য-

(ক) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিপর্যয় মোকাবিলায় ভারতীয়দের পূর্ণ সহযোগিতা লাভ এবং

(খ) ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান ও শাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে ভারতীয় নেতৃবর্গের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার জন্য ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিশিষ্ট আইনজ্ঞ স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রীপস ভারতে এসে ছিলেন ।

ক্রিপসের প্রস্তাবঃ

স্যার স্টাফোর্ড ক্রীপস ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২২শে মার্চ দিল্লীতে এসে পৌছান । তিনি মূলত কংগ্রেস ও মুসলিম লিগসহ অন্যান্য দলের নেতৃবর্গের সঙ্গে দীর্ঘ্য আলাপ-আলোচনার পর নীচের প্রস্তাবগুলি পেশ করেন:-

১) যুদ্ধের অবসানে ভারতীয়দের কানাডার মতো ডোমিনিয়নের মর্যাদা দেওয়া হবে ।

২) ভারতীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সভা গঠন করা হবে এবং সেই সভাকে ভারতের নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেওয়া হবে ।

৩) নতুন সংবিধান অনুসারে, ভারতের যে-কোনো প্রদেশ বা দেশীয় রাজ্য ইচ্ছে করলে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও থাকতে পারবে ।

৪) সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষণ-ব্যবস্থা বহাল রাখা ।

৫) প্রদেশগুলোর প্রাদেশিক আইনসভা সংবিধান সভার সদস্যদের নির্বাচণ করবে, অন্যদিকে দেশীয় রাজ্যের রাজারা তাঁদের সদস্যদের মনোনীত করবেন ।

৬) ভারতের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকবে এবং বড়লাটের কার্যনির্বাহক কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘ভিটো’ ক্ষমতা প্রয়োগ করে তা বাতিল করার অধিকার বড়লাটের থাকবে ।

ক্রীপস মিশনের ব্যর্থতার কারণ:-

ক্রীপসের প্রস্তাবগুলো ভারতের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি, কারণ-

(ক) এই প্রস্তাবে পাকিস্তানের দাবিকে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ভারতের প্রতিরক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব ভারতীয়দের হাতে ছেড়ে দিতেও ব্রিটিশ সরকার রাজি ছিল না ।

(খ) ক্রীপস প্রস্তাবিত জাতীয় সরকারকে ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার মতো সম-মর্যাদা ও ক্ষমতা দেওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না ।

এক কথায় ক্রীপসের প্রস্তাবে ব্রিটিশ সরকারের সদিচ্ছার অভাব প্রকাশ পায়, তাই ভারতের প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলই ক্রীপস -এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ।

******.

Related Items

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[দশম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) ঠান্ডা লড়াই কথাটি সর্বপ্রথম কে জনপ্রিয় করে তোলেন ? কোন দুটি দেশ ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ছিলেন ?

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[নবম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন কে ? এই সভার সদস্য সংখ্যা কত ? লোকসভার গঠন ও কার্যাবলি সংক্ষেপে বর্ণনা করো ।

উত্তর: রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন উপরাষ্ট্রপতি । এই রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা হল ২৫০ জন ।

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ৫ম: অংশ]

প্রশ্ন:- (২৯) দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা কে ছিলেন ? স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ দিকে এই নীতি কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অবনতি ঘটায় ?

উত্তর:- দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা ছিলেন স্যার সৈয়দ আহম্মদ খাঁ

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ৪র্থ অংশ]

প্রশ্ন:- (২২) আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার কোথায় অনুষ্ঠিত হয় ? বিচারাধীন দুই জন আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতির নাম লেখ ।

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[সপ্তম অধ্যায়- ৩য় অংশ]

প্রশ্ন:- (১১) ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণ নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য কতটা দায়ী ছিল ?