অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[তৃতীয় অধ্যায়- ১ম: অংশ]

Submitted by administrator on Wed, 03/07/2012 - 21:44

তৃতীয় অধ্যায়: ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম শতকে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ

প্রশ্ন:- (১) ভারতে কোম্পানি শাসনকালে কৃষক বিদ্রোহের কারণ কী ছিল ? দুটি উপজাতি বিদ্রোহের নাম উল্লেখ করো।

উত্তর:- ব্রিটিশ শাসনের প্রথম শতকের কৃষক বিদ্রোহের অনেকগুলি কারণ ছিল , যেমন ;

(১) কোম্পানি প্রবর্তিত নতুন ভূমিরাজস্ব নীতির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকশ্রেণি : ব্রিটিশ শাসনের প্রথম শতকে কোম্পানি প্রবর্তিত নতুন ভূমিরাজস্ব নীতি ও ভুমিরাজস্ব ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায়ের জন্য আমিলদার ও ইজারাদারদের অত্যাচার, প্রচলিত ভারতীয় সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিবিহীন নতুন আইন ও বিচারব্যবস্থায় ভারতীয় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, যা তাদের ব্রিটিশ বিরোধী করে তুলেছিল ।

(২) কোম্পানি প্রবর্তিত ভূমিরাজস্বের উচ্চ হার : চিরস্থায়ী, মহলবাড়ি ও অন্যান্য ধরণের রাজস্বব্যবস্থা এবং নতুন ভুমিরাজস্ব ব্যবস্থায় ভুমিরাজস্বের হার ছিল খুবই বেশি । এইসব ভুমি-রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ায় ভারতের গ্রামীণ জীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো প্রায় ভেঙ্গে পড়ে ।

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম অর্ধে কোম্পানির শাসনকালে দুটি উপজাতি বিদ্রোহের নাম ছিল- কোল বিদ্রহ এবং সাঁওতাল বিদ্রোহ।

কোল বিদ্রোহ:-উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ব্রিটিশ শানের বিরুদ্ধে যেসব আদিবাসী বিদ্রোহ ঘটে, তাদের মধ্যে কোল বিদ্রোহ ছিল অন্যতম।

কোল বিদ্রোহের কারণ - সুপ্রচীনকালেই ‘কোল’নামে এক আদিম উপজাতি বর্তমান বিহারের সিংভূম, মানভূম, ছোটোনাগপুর প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাস শুরু করে । কোলরা হো, মুন্ডা, ওরাওঁ প্রভৃতি সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল । অন্যান্য আদিম জাতিগুলির মতো কোলরাও ছিল কৃষিজীবী । নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার অঙ্গ হিসাবে ইংরেজ সরকার বহিরাগত লোকদের কোল সম্প্রদায়ের জমিদার হিসাবে নিযুক্ত করেন। তাঁরা চড়া হারে রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বিচার ও আইন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে কোল সমাজের ওপর আঘাত হানে, এইসব শোষণ ও বঞ্চনা থেকেই ১৮৩১ সালে কোল বিদ্রহের সূত্রপাত হয়।

বিদ্রোহের ব্যাপ্তি ও দমন- রাঁচি, হাজারিবাগ, সিংভূম, পালামৌ প্রভৃতি অঞ্চলে কোল বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। সিংরাই, বুদ্ধ ভগৎ, জোয়া ভগৎ প্রভৃতি নেতাগণ এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন । কোল বিদ্রোহের পাশাপাশি মানভূমের ভূমিহীন জনসাধারণ বিদ্রোহী হয়ে সরকারি কাছারি ও পুলিশ ঘাঁটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত সৈন্যবাহিনী নিয়োগ করে এই বিদ্রোহ দমন করতে হয়। কোল বিদ্রোহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, বিদ্রোহ চলাকালীন সময়ে কোলদের ঐক্যবদ্ধ রূপ। তাছাড়া বিদ্রোহীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ ছিল ইংরেজ ও বহিরাগত জমিদারবর্গ । চার্লস মেটকাফের মতে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটানো ।

ফলাফল:- কোল বিদ্রোহের পরে উপজাতিদের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি নামে একটি ভূখন্ড নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় । এছসড়া এই ভূখন্ডে প্রচলিত ব্রিটিশ আইন কার্যকর করা হবে না বলে ঘোষণা করা হয় । এসব সত্ত্বেও খাজনার হার ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং শোষণের মাত্রাও হ্রাস পায়নি।

প্রশ্ন:- (২) সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের কারণ ও ব্যর্থতা সম্পর্কে লেখ ।

উত্তর:- সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের কারণ:- বাংলার কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলেন সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায়। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা ও বিহারের দরিদ্র কৃষকেরা অন্ন ও বস্ত্রের জন্য সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের ধ্বজা তোলেন। সমকালীন বিভিন্ন তথ্য ও সূত্র থেকে জানা যায় যে, এইসব বিদ্রোহের কারণ ছিল-

(১) অত্যধিক ভূমিরাজস্ব ও কৃষক উচ্ছেদঃ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধার্য করা অত্যধিক রাজস্ব, জমি থেকে ইচ্ছামতো কৃষক উচ্ছেদ প্রভৃতি কারণে বাংলা-বিহারের কৃষকরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়।

(২) তীর্থকরঃ ইচ্ছামতো সন্ন্যাসী ও ফকিররা মাঝেমধ্যে দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে গেলে, সরকার থেকে তাদের ওপর তীর্থকর বাসানো হত । এতে সন্ন্যাসী ও ফকিররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

(৩) কোম্পানির কর্মচারীদের জলুমঃ ফকির ও সন্ন্যাসীদের মধ্যে অনেকেই রেশম ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কোম্পানির কর্মচারীরা নানা ভাবে তাদের এই ব্যাবসাতে বাধা দিত।

এই সব অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় সর্বপ্রথম সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ শুরু হয়। ক্রমে তা দাবানলের মতো মালদহ, রংপুর, দিনাজপুর, কোচবিহার, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। অত্যাচারিত ও নির্যাতিত দরিদ্র কৃষক, মোগল সেনাবাহিনীর বেকার সৈন্য এবং সন্ন্যাসী ও ফকিরদের বিভিন্ন সম্প্রদায়, এই বিদ্রোহে অংশ নেয়। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এই বিদ্রোহে অংশ নেয়। এই বিদ্রোহকে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বলে অভিহিত করা হলেও উইলিয়াম হান্টার সর্বপ্রথম সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কৃষক বিদ্রোহ বলে অভিহিত করেছেন। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর আনন্দমঠ উপন্যাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের জীবন্ত চিত্র তুলে ধরেছেন।

ব্যর্থতার কারণঃ

১) নেতৃত্বের দুর্বলতা,

২) সঠিক পরিকল্পনার অভাব,

৩) আদর্শহীনতা এবং

৪) উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্রের অভাব প্রভৃতি কারণে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

প্রশ্ন (৩): ভারতবর্ষে ওয়াহাবি আন্দোলন কে শুরু করেন ? এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল ?

উত্তরঃ ভারতবর্ষে ওয়াহাবি আন্দলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলির অধিবাসী শাহ সৈয়দ আহমদ (১৭৮৬-১৮১৩ খ্রি.)।

ওয়াহাবি আন্দলনের উদ্দেশ্যঃ

১) ‘ওয়াহাবি’ শব্দের অর্থ হল ‘নবজাগরণ’। আরব দেশে আব্দুল ওয়াহাব (১৭৬৩-৮৭ খ্রি. ) নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যাক্তি ইসলাম ধর্মের সংস্কারের জন্য এই আন্দোলনের সূচনা করে ছিল।

২) উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের সূচনা করেন দিল্লীর খ্যাতনামা সন্ত শাহ ওয়ালি উল্লাহ ও তাঁর পুত্র আজিজ । প্রথম দিকে এই আন্দোলন ছিল ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন এবং এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের শুদ্ধিকরণ।

ভারতে ওয়াহাবি সম্প্রদায়ের যথার্থ প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রায়বেরিলির সৈয়দ আহমদ (১৭৮৬-১৮৩১ খ্রি.) । তিনি আরবের ওয়াহাবিদের অনুকরণে ধর্মসংস্কারের কথা প্রচার করতে শুরু করেন।

৩) ওয়াহাবি আন্দোলন মূলত ধর্মসংস্কার আন্দোলন হিসাবে শুরু হলেও অচিরেই তা রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিণতি লাভ করে । সৈয়দ আহমদ বলেন, ইংরেজ শাসনের ফলে ভারতবর্ষ ‘দার-উল-হার্ব’বা বিধর্মীর দেশে পরিণত হয়েছে, একে ‘দার-উল-ইসলাম’অর্থাৎ ইসলামের দেশে পরিণত করতে হবে । সুতরাং এই আন্দোলনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বিধর্মী ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

৪) প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, ওয়াহাবি আন্দোলন কখনই জাতীয় আন্দোলন ছিল না এবং এই আন্দোলনের চরিত্র সাম্প্রদায়িকতামুক্তও ছিল না । ইংরেজ শাসনের পরিবর্তে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করাই ছিল ওয়াহাবি আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন:- (৫) চুয়াড় বিদ্রোহ সম্পর্কে যা জান লেখো ।

উত্তর:- চুয়াড় বিদ্রোহ:- চুয়াড় বা চোয়াড়রা ছিল বাংলার মেদিনীপুর জেলের জঙ্গলমহলের অধিবাসী সম্প্রদায়। চাষবাস ও পশু শিকারের সঙ্গে জড়িত থাকলেও যুদ্ধবিগ্রহ ছিল তাদের প্রধান পেশা । সাধারণত চুয়াড় সম্প্রদায়ের মানুষেরা মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ধলভূমের স্থানীয় জমিদারদের অধীনে রক্ষী বা পাইকের কাজ করত । পাইকের কাজ করার বিনিময়ে তারা যে জমি ভোগ করত তা পাইকান জমি নামে পরিচিত ছিল। বাংলায় কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠার পর কোম্পানির কর্তৃপক্ষ এই অঞ্চলের জমিদারদের ওপর অত্যন্ত চড়া হারে ভূমিরাজস্ব ধার্য করে । এর বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের জমিদাররা বিদ্রোহ ঘোষণা করলে তাঁদের পাইক চুয়াড়গণও সমগ্র জঙ্গলমহল জুড়ে বিদ্রোহ করে- এই বিদ্রোহ প্রায় ৩০ বছর ধরে (১৭৬৯ - ১৭৯৯ খ্রি.) চলে।

১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে ঘাটশিলায় (ধলভূমের) রাজা জগন্নাথ সিংহ প্রথম ধল বিদ্রোহ ঘোষণা করেন । চুয়াড়রাও এই বিদ্রোহে সক্রিয় ভাবে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত হয় । অবশেষে কোম্পানি জগন্নাথ সিংহের ভ্রাতুষ্পুত্রকে জমিদারি ফিরিয়ে দেয়। অন্যদিকে ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে ধাদকার শ্যামগঞ্জন-এর নেতৃত্বে চুয়াড়রা বিদ্রোহ ঘোষণা করেও ব্যার্থ হয়। ১৭৯৮-৯৯ খ্রিস্টাব্দে দুর্বল সিংহের নেতৃত্বে চুয়াড় বিদ্রোহ সবচেয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল, কিন্তু কোম্পানির সেনাদল নির্মম অত্যাচার করে এই বিদ্রোহ দমন করে।

*****

Related Items

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[দশম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) ঠান্ডা লড়াই কথাটি সর্বপ্রথম কে জনপ্রিয় করে তোলেন ? কোন দুটি দেশ ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ছিলেন ?

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[নবম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন কে ? এই সভার সদস্য সংখ্যা কত ? লোকসভার গঠন ও কার্যাবলি সংক্ষেপে বর্ণনা করো ।

উত্তর: রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন উপরাষ্ট্রপতি । এই রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা হল ২৫০ জন ।

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ৫ম: অংশ]

প্রশ্ন:- (২৯) দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা কে ছিলেন ? স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ দিকে এই নীতি কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অবনতি ঘটায় ?

উত্তর:- দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা ছিলেন স্যার সৈয়দ আহম্মদ খাঁ

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ৪র্থ অংশ]

প্রশ্ন:- (২২) আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার কোথায় অনুষ্ঠিত হয় ? বিচারাধীন দুই জন আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতির নাম লেখ ।

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) কীভাবে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয় ?