অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[তৃতীয় অধ্যায়- ৩য়: অংশ]

Submitted by administrator on Sun, 04/22/2012 - 20:04

প্রশ্ন:- (১১) মহাবিদ্রোহের বিস্তার ও প্রকৃতি আলোচনা করো ।

উত্তরঃ মহাবিদ্রোহের বিস্তার:-

১) সিপাহি বিদ্রোহ প্রথমে শুরু হয় মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে কলকাতার উত্তরে ব্যারাকপুরে ।

২) এই বিদ্রোহের সংবাদ লক্ষ্ণৌ-এর সিপাহিদেরও সংক্ক্রামিত করেছিল ।

৩) লক্ষ্ণৌ-এর পরে বিদ্রোহ মীরাটে প্রসারিত হল ।

৪) মিরাট থেকে এই বিদ্রোহ দ্রুত গতিতে দিল্লীতে ছড়িয়ে পড়ে । দিল্লীতে সিপাহিরা স্ত্রী-পুরুষ-শিশু নির্বিচারে ইংরেজদের হত্যা করে ।

৫) এর পর বিদ্রোহ গাঙ্গেয় প্রদেশগুলিতে ও মধ্যভারতে ছড়িয়ে পড়ে । ফিরোজপুর, মজফ্‌ফর নগর ও আলিগড়ে সিপাহিরা বিদ্রোহী হয় ।

৬) এরপর পাঞ্জাবের অন্তর্গত নৌসরা ও হতমর্দনেও বিদ্রোহ সংক্রমিত হয়। অযোধ্যা ও উত্তরপ্রদেশের নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করে । অযোধ্যার সম্পত্তিচ্যুত তালুকদাররা বিদ্রোহে যোগ দেন।

৭) রোহিলাখন্ডের পূর্বতন সর্দাররা এই বিদ্রোহে যোগ দেন। এদের মধ্যে বেরিলির খান বাহাদুর, নাজিরাবাদের মহম্মদ খাঁ, গোরখপুরের মহম্মদ হাসান প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য ।

৮) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে বাংলার চট্টগ্রামের সিপাহিরা বিদ্রোহী হন। কিন্তু সেখানে জনসাধারণের সমর্থন না পাওয়ায় সিপাহিরা পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন ।

৯) নর্মদা নদীর দক্ষিণাঞ্চলে শান্তি একরকম অক্ষুন্নই ছিল, যদিও সিপাহিদের মধ্যে উত্তেজনার অভাব ছিলনা ।

১০) রাজস্থানেও বিদ্রোহ সংক্রামিত হয় । কিন্তু রাজপুত শাসকরা ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত থাকায় সেখানে বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারেনি।

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে বাদানুবাদের অন্ত নেই। বিদ্রোহের সময়কাল থেকে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে নানা ধরনের মতামত উপস্থাপিত হয়েছে। উপস্থাপিত এই মতামত গুলি ব্যাখ্যাকালে যে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে দেখা যায়, তাহলে এই বিদ্রোহ কি নিছক সিপাহিবিদ্রোহ ছিল ? অথবা, এই বিদ্রোহ কী জাতীয় বিদ্রোহের মর্যাদা পেতে পারে ?

আলোচনার সুবিধার্থে এই মতামত গুলিকে কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়, যেমন:-

ম্যালেসন, জন কে, স্যার জন লরেন্স, রবাটর্স প্রমুখ ইংরেজ ঐতিহাসিকরা সিপাহি বিদ্রোহকে নিছক সিপাহি বিদ্রোহ ছাড়া অন্যকিছু মনে করেন না। বামপন্থী চিন্তাবিদ রজনীপাম দত্ত এই বিদ্রোহকে রক্ষণশীল ও সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলির অভ্যুত্থান বলে উল্লেখ করেছেন।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের পরষ্পর বিরোধী মতামত বিশ্লেষণের শেষে একথা বলা যায় যে, এই বিদ্রোহ প্রসঙ্গে কোনও বিশেষ মতামতটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য বা ভিত্তিহীন বলা যায় না। আসলে প্রত্যেকটি মতে কিছু না কিছু সত্যি উন্মোচিত হয়েছে। তবে এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক বেলি (C.A Bayly) বলেছেন ‘১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহ কেবলমাত্র একটি আন্দোলন নয়। এটাকে কৃষক বিদ্রোহ বলা যেতে পারে অথবা জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম বা অন্যকিছু’।

প্রশ্ন:- (১২) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহে জনসাধারণ কী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ?

মহাবিদ্রোহে জনগণের অংশ গ্রহণ:- ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ভারতীয় সিপাহিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংগ্রামে নামা ছিল ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের গণবিদ্রোহের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

১) মহাবিদ্রোহে জনগণের প্রত্যক্ষভাবে অংশ গ্রহণ:- অযোধ্যা, দিল্লী, মধ্যভারত, বিহার প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহ প্রকৃত গণ-বিদ্রোহের রূপ ধারণ করেছিল, যেমন:-

১) গ্রামাঞ্চলে কোম্পানি প্রবর্তিত নতুন ভূমিরাজস্ব আইন দ্বারা সুরক্ষিত সুদখোর মহাজন ও নতুন জমিদারদের বাড়িঘর ও কাছারি লুঠ করা হয় (যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় ডাকাতরাও এই সব লুঠতরাজে অংশ নিয়েছিল)।

২) ব্যবসায়ী ও মহাজনদের ওপর কর বসিয়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের খাদ্যশস্য ও যুদ্ধের রসদপত্র কেনা হয়।

৩) দিল্লী, লক্ষ্ণৌ, বারবেরিলি প্রভৃতি শহরের জনসাধারণ তাদের বল্লম, টাঙ্গি, ছুরি, দা, কাস্তে প্রভৃতি নিয়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং কোম্পানির অনুগত সেনাদের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াই চালায়।

৪) দিল্লী, অযোধ্যা, কানপুর, লক্ষ্ণৌ প্রভৃতি অঞ্চলে রাস্তাঘাট নষ্ট করে গোরু-মোষ-ঘোড়ার গাড়ি ও স্থানীয় নৌকা গুলি সরিয়ে ফেলে কোম্পানির সেনাবাহিনীর রসদপত্র সরবরাহের কাজে বাধা দেওয়া হয়।

মহাবিদ্রোহে জনগণের পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ:- ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহে ভারতের জনগণ পরোক্ষভাবেও অংশ নিয়েছিল, যেমন-

১) স্থানীয় ভৃত্য, পরিচারক ও আয়ারা তাদের কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে ইংরেজদের বিপদে ফেলে।

২) বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় জনগণ ইংরেজদের কাছে বিদ্রোহী সিপাহিদের গতিবিধি সম্পর্কে কোনো আগাম খবর না দিয়ে এবং

৩) নানারকম গুজব রটিয়ে ইংরেজদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে।

পরিশেষে বলতে হয়, যদিও ভারতীয় জনগণের একটা বড়ো অংশ (যেমন- বোম্বাই, মাদ্রাজ, পশ্চিম পাঞ্জাব, বাংলা প্রভৃতি) এবং ভারতের ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইংরেজ কোম্পানির বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেনি, তবুও ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যে গণবিদ্রোহের রূপ ধারণ করেছিল, একথা অস্বীকার করা যায় না।

*****

Related Items

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[দশম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) ঠান্ডা লড়াই কথাটি সর্বপ্রথম কে জনপ্রিয় করে তোলেন ? কোন দুটি দেশ ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ছিলেন ?

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[নবম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন কে ? এই সভার সদস্য সংখ্যা কত ? লোকসভার গঠন ও কার্যাবলি সংক্ষেপে বর্ণনা করো ।

উত্তর: রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন উপরাষ্ট্রপতি । এই রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা হল ২৫০ জন ।

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ৫ম: অংশ]

প্রশ্ন:- (২৯) দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা কে ছিলেন ? স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ দিকে এই নীতি কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অবনতি ঘটায় ?

উত্তর:- দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা ছিলেন স্যার সৈয়দ আহম্মদ খাঁ

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ৪র্থ অংশ]

প্রশ্ন:- (২২) আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার কোথায় অনুষ্ঠিত হয় ? বিচারাধীন দুই জন আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতির নাম লেখ ।

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) কীভাবে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয় ?