প্রশ্ন: (৭) অনুশীলন সমিতি কে প্রতিষ্ঠা করেন ? মিত্রমেলার প্রতিষ্ঠাতা কে ?
উত্তর: অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা হলেন সতীশচন্দ্র বসু।
মিত্রমেলার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর।
প্রশ্ন: (৮) বিংশ শতকের শুরুতে বিপ্লবীদের মূলমন্ত্র কী ছিল ? ক্ষুদিরাম বসু ও লালা হরদয়ালকে কেন মনে রাখা হয় ?
উত্তর: ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনই ছিল বিংশ শতকের শুরুতে বিপ্লবীদের মূলমন্ত্র।
ক্ষুধিরাম বসুকে মনে রাখার কারণ:
১) বিংশ শতকের প্রথম ভাগের বিপ্লবী আন্দোলনে যুগান্তর দলের সক্রিয় সদস্য ক্ষুদিরাম বসুর (১৮৮৯-১৯০৮ খ্রি.) অবদান চিরস্মরণীয় ।
২) এই সময় বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দমন মূলক কার্যকলাপের জন্য যুগান্তর দল কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় ।
৩) যুগান্তর দলের দুই তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীকে কিংসফোর্ডকে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু নিরাপত্তার কারণে কিংসফোর্ড এই সময় বিহারের মজঃফরপুরে বদলি হয়ে যান । সেখানেই তাঁকে বোমা মেরে হত্যা করতে গিয়ে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি ব্যর্থ হন, ক্ষুদিরাম পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান এবং বিচারে তাঁর ফাঁসি হয় (১১ই আগস্ট ১৯০৮ খ্রি.) ।
৪) অগ্নিযুগের প্রথম শহিদ ক্ষুদিরামের নির্ভীক দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ বাংলার যুবসমাজকে একদিন বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল- সেই জন্যই তাঁকে মনে রাখা হয়।
লালা হরদয়ালকে মনে রাখার কারণ:
১) সাহারানপুর এবং রুরকি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত লালা হরদয়াল (১৮৮৪-১৯৬৯ খ্রি.) ছিলেন পাঞ্জাবের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ।
২) ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নেতৃত্বে পাঞ্জাবে বিপ্লবী কার্যকলাপ ব্যাপক আকার ধারণ করে । সেই সময় তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘বয়কট’ও 'প্রত্যক্ষ সংগ্রামের' ডাক দেন ।
৩) ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারত ছেড়ে বিদেশে চলে যান এবং ১৯১৩ সালে আমেরিকায় প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে গদর পার্টির প্রতিষ্ঠা করেন । ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে যে-কোনোও উপায়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন করাই ছিল এই দলের লক্ষ্য । লালা হরদয়ালের দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের আদর্শ জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, এইজন্য তাকে মনে রাখা হয় ।
প্রশ্ন: (৯) সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বলতে কী বোঝায় ? পরাধীন ভারতের সংগ্রামশীল আন্দোলনে বালগঙ্গাধর তিলকের ভূমিকা আলোচনা করো ।
উত্তর: উনবিংশ শতাব্দীর শেষে ও বিংশ শতকের শুরুতে ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল কথা ছিল: স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার । দয়া ভিক্ষা করে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না । দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আত্মশক্তির দ্বারাই দেশের স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় । পরাধীন ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তিনটি ধারায় পরিচালিত হয়, যথা;
১) আত্মশক্তির আদর্শ বা স্বদেশি আন্দোলন,
২) নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন বা বয়কট এবং
৩) সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন।
ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বালগঙ্গাধর তিলকের ভূমিকা:
ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বালগঙ্গাধর তিলকের (১৮৫৬-১৯২০) গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। মহারাষ্ট্রের অগ্রণী পুরুষ বালগঙ্গাধর তিলকের ব্যক্তিত্ব ও কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে মহারাষ্ট্র তথা ভারতের জাতীয় আন্দোলন বলিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত রূপ ধারণ করেছিল। তিনি ছিলেন ভারতের সংগ্রামী জাতীয়তাবাদের পথিকৃৎ।
১) প্রথম পর্যায়: জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি ‘মারহাট্টা’ নামে ইংরেজি এবং ‘কেশরী’ নামে মারাঠি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন । এই দুটি পত্রিকার মাধ্যমে তিনি একদিকে কংগ্রেসের ভিক্ষাবৃত্তি নীতির কঠোর সমালোচনা করেন এবং ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে উদ্যোগী হন । এরপর তিলকের উদ্যোগে মহারাষ্ট্রে ‘গণপতি উৎসব’সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয় । ১৮৯৫ সালে তিনি ‘শিবাজী উৎসব’কে জাতীয় উৎসবে পরিণত করেন।
২) দ্বিতীয় পর্যায়: ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের পর তিলক মহারাষ্ট্রের রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর আঙিনায় তাঁর জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপ শুরু করেন। বাংলার স্বদেশি আন্দোলনকে তিলক অকুন্ঠ সমর্থন জানান। তিনি ঘোষণা করেন, ‘স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার’ । এরপর থেকে তিনি চরমপন্তী নেতা হিসাবে জনপ্রিয়তা র্জন করেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে লোকমান্য তিলকের গ্রেফতারের প্রতিবাদে বোম্বাইয়ের শ্রমিকরা হরতাল পালন করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে সাত বছরের জন্য তিনি ব্রহ্মদেশের মান্দালয়ে নির্বাসিত হন।
প্রশ্ন: (১০) পরাধীন ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনে বিনায়ক দামোদরের অবদান লেখো ।
উত্তর:-বিপ্লবী আন্দোলনে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ভূমিকা:
১) মহারাষ্ট্রের বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর (১৮৮৩-১৯৬৬ খ্রি.) ।
২) তিনি ‘মিত্রমেলা’নামে এক সমিতি গঠন করে তরুণদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়াসী হন । তরুণদের অস্ত্রবিদ্যায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যাপারেও তিনি যত্নশীল ছিলেন ।
৩) ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘অভিনব ভারত’নামে এক বিপ্লবী সমিতি গঠন করে ভারতের নানা স্থানে শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে দেন ।
৪) ১৯০৬ সালে বিনায়ক লন্ডনে চলে যান এবং গোপনে ভারতে অস্ত্রশস্ত্র পাঠাতে থাকেন ।
৫) ইতিমধ্যে তাঁর অনুগামী মদনলাল ধিংড়া ইংল্যান্ডে স্যার কার্জন উইনিকে হত্যা করেন । এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে সাভারকরকে গ্রেফতার করা হয় । বিচারে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয় ।
৬) দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর কারাবাসের পর তিনি মুক্ত হলে তাঁকে “বীর সাভারকর’ আখ্যা দেওয়া হয় ।
প্রশ্ন: (১১) ভারতের কোথায় সর্ব প্রথম বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা হয় ? মাদাম কামা কে ছিলেন ? ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অরবিন্দ ঘোষের ভূমিকা আলোচনা করো ।
উত্তর: ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম মহারাষ্ট্রেই বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা হয়।
মাদাম কামা-র প্রকৃত নাম ছিল ভিকাজি রুস্তম কামা । তিনি ভারতীয় বিপ্লববাদের জননী নামে খ্যাত । তিনি প্রথমে লন্ডন ও পরে প্যারিসে ভারতীয় বিপ্লবীদের কাজকর্মে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করতেন ।
ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অরবিন্দ ঘোষের ভূমিকা:
বিংশ শতাব্দীর প্রথমে ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় । এই সময় জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের আচার-আচরণ ও কার্যকলাপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে অনেকে জাতীয় আন্দোলনকে সক্রিয় ও আন্দোলনমুখী করে তুলতে চেয়ে ছিলেন । এই সংগ্রামী আন্দোলনের মূর্তপ্রতীক ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ (১৮৭২-১৯৫০ খ্রি.)।
১) কংগ্রেসের প্রতি মনোভাব: তিলকের মতো অরবিন্দও কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের ও কংগ্রেসি আন্দোলনের কঠোর সমালোচনা করেন । বরোদা থেকে প্রকাশিত ‘ইন্দু প্রকাশ’পত্রিকার কয়েকটি প্রবন্ধে (১৮৯৩-৯৪ খ্রি.) তিনি কংগ্রেসের নরমপন্থীদের আবেদন-নিবেদন নীতির তীব্র সমালোচনা করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা দাবি করেন।
২) কার্য কলাপ: বাংলার স্বদেশি আন্দোলন শুরু হবার পর অরবিন্দ বরদায় অধ্যাপনার কাজ ত্যাগ করে কলকাতায় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কলেজের অধ্যক্ষ পদ গ্রহণ করেন । ওই বছরেই তাঁর সম্পাদনায় ইংরেজি দৈনিক ‘বন্দেমাতারম’ প্রকাশিত হয় । অল্প সময়ের মধ্যেই ‘বন্দেমাতারম’পত্রিকাটি বাংলার রাজনৈতিক জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে । এই পত্রিকায় অরবিন্দ ঘোষণা করেন “স্বরাজ হল বর্তমান অবস্থায় প্রাচীন ভারতের আদর্শকে পুণঃপ্রতিষ্ঠা করা; সত্যযুগের জাতীয় গৌরবকে পুনরুদ্ধার করা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে বেদান্তের আদর্শ প্রচার করা”।
আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা: অরবিন্দ তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপ দু’ভাবে পরিচালিত করেন। একদিকে তিনি কংগ্রেসে নরমপন্থী নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিলেন এবং অন্যদিকে গোপন বৈপ্লবিক কার্য পরিচালনার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে চেয়ে ছিলেন। অরবিন্দের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বারীন্দ্রকুমার ঘোষ তরুণ বাঙালি বিপ্লবীদের নিয়ে কলকাতার মুরারিপুকুরে তাঁদের পৈত্রিক বাগানবাড়িতে একটি গোপন বিপ্লবী কর্মকেন্দ্র গড়ে তোলেন । ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে অরবিন্দ ও তাঁর সহকর্মীরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হন এবং ঐতিহাসিক আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁদের বিচার শুরু হয় । এই মামলা প্রায় এক বছর ধরে চলে । এই মামলায় আসামি পক্ষের উকিল ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ (তিনি পরবর্তীকালে ‘দেশবন্ধু’নামে পরিচিত হন)। আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি দৃপ্তকন্ঠে ঘোষণা করেন যে, স্বাধীনতার আদর্শ প্রচার করা কোনো অপরাধ নয়। আলিপুর বোমার মামলা থেকে মুক্ত হয়ে অরবিন্দ রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে দক্ষিণ ভারতের পন্ডিচেরীতে আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর প্রধান লক্ষ ছিল, আধ্যাত্মচেতনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে দিব্য জীবনের সন্ধান লাভ।
****
- 1247 views