প্রশ্ন: (১৩) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বয়কট আন্দোলনের কর্মসূচি কী ছিল ? বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন হিসেবে বয়কট আন্দোলনের গুরুত্ব কী ছিল ?
উত্তর: বয়কট আন্দোলনের কর্মসূচি:
১) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ করলে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শীঘ্রই প্রতিবাদের পর্যায় অতিক্রম করে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলনে পরিনত হয় । এই গণআন্দোলনের প্রথম ও মুখ্য কর্মসূচি ছিল ‘বয়কট’। ‘বয়কট’ কথার অর্থ হল বর্জন । স্বদেশি আন্দোলনের যুগে ‘বয়কট’ কথাটির অর্থ ছিল শুধুমাত্র বিলিতি বস্ত্র বা বিলিতি জিনিসপত্রই নয়- বিলিতি চিন্তাধারা, আদব-কায়দা, শিক্ষাব্যবস্থা, আইনব্যবস্থা, পৌরসভা, আইনসভা প্রভৃতিকে বর্জন করার নীতি বা আদর্শ । কৃষ্ণকুমার মিত্র সম্পাদিত ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকার (১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ই জুলাই) সম্পাদকীয় প্রবন্ধে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সামগ্রিক বয়কট আন্দোলনের আহ্বান জানানো হয়।
২) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই জুলাই বাগেরহাটে এক বিশাল জনসভায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘বয়কটের’ প্রস্তাব নেওয়া হয় । এই প্রস্তাবে বলা হয় যে, যতদিন পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ রদ না করা হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত ব্রিটিশ পণ্যসামগ্রী বর্জন করা হবে এবং আগামী ছয় মাস পর্যন্ত সব রকমের জাতীয় আনন্দ-উৎসবের অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে ।
৩) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ২১শে জুলাই দিনাজপুরের মহারাজার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় যে সব প্রস্তাব গৃহীত হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জেলাবোর্ড, পৌরসভা ও পঞ্চায়েতের সব সদস্যরা পদত্যাগ করবেন এবং আগামী এক বছর ধরে জাতীয় শোক পালন করা হবে ।
৪) ক্রমে ক্রমে বাংলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে জনসভা আয়োজিত হয় এবং বিলাতি পণ্যসম্ভারের বিরুদ্ধে বয়কট প্রস্তাব গৃহীত হয় ।
৫) ‘বয়কট’ আন্দোলনে বাংলার ছাত্র সমাজ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে । ১৯০৫ সালে ১৭ই ও ১৮ই জুলাই রিপন কলেজে (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) এক ছাত্র সমাবেশে ‘বয়কট'কে আদর্শ পবিত্র শপথ হিসাবে গ্রহণ করা হয় । ৩১শে জুলাই কলকাতার সবকটি কলেজের এক বিরাট ছাত্র সমাবেশে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয় এবং ছাত্রদের একটি কেন্দ্রীয় সংগ্রাম সমিতি গঠন করা হয় । ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ৭ই আগস্ট শিক্ষকদের পরিচালনায় প্রায় ৫০০০ জন ছাত্র প্রথমে কলেজ স্কোয়ারে সমবেত হয় পরে শোভাযাত্রা করে টাউন হলে জমায়েত হয় । সেদিন কলকাতার দোকান-বাজার ও যানবাহন প্রায় বন্ধ ছিল।
বয়কট আন্দোলনের গুরুত্ব:
১) ‘বয়কট’ প্রস্তাব বাংলা থেকে সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে । ব্রিটিশ পণ্যসম্ভার, বিশেষ করে ম্ম্যাঞ্চেস্টারের সুতিবস্ত্র বর্জন করার আহ্বান ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে । ছাত্ররা বিলাতি লবণ ও চিনি খরিদ করে তা নষ্ট করতে শুরু করে; শহরের বড়ো বড়ো দোকানে ছাত্রদের পিকেটিং শুরু হয় এবং ক্রেতাদের বিলাতি পণ্যসম্ভার খরিদ না করার জন্য অনুরোধ করা হয়।
২) বয়কট বা বর্জন নীতি সব স্তরের মানুষকে প্রভাবিত করেছিল। বিলাতি পণ্যসম্ভারের বয়কট বা বর্জন করার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কট শুরু হয়। ধোপা, নাপিত, মুচি প্রভৃতি শ্রেণির সমাজসেবীরা ইংরেজদের সবরকম সেবা করা থেকে বিরত থাকে ।
৩) বিভিন্ন সভাসমিতিতে বিদেশি পণ্য বর্জন করে স্বদেশিপণ্য ব্যবহারের শপথ নেওয়া হয় । শহরে এবং গ্রামেগঞ্জে প্রকাশ্যে বিদেশি পণ্য পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং স্বদেশি পণ্য ক্রয়ের সমারোহ শুরু হয় । এর ফলে বিলাতি পণ্যের চাহিদা বিশেষভাবে কমে যায় । ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের এক সরকারি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, এক বছরের মধ্যে বিলাতি সাবান, বিলাতি লবণ, সুতিকাপড়, বিদেশি জুতা ও সিগারেটের আমদানি অভাবনীয়ভাবে কমে গিয়েছিল ।
৪) বয়কট আন্দোলনের পরোক্ষ প্রভাবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বদেশি কুটিরশিল্প ও বড়ো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। স্বদেশি তাঁতবস্ত্র, সাবান, লবণ, চিনি ও চামড়াজাত দ্রব্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন স্থানে কলকারখানা গড়ে ওঠে। মাদ্রাজে চিদাম্বরম পিল্লাই স্বদেশি জাহাজ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। স্বদেশি যুগে ভারতে শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হল স্যার জামসেদজি টাটার প্রতিষ্ঠিত জামসেদপুরের লৌহ ও ইস্পাত কারখানা। এযুগে বাংলায় প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল, কারখানার প্রসার ঘটে । ডঃ নীলরতন সরকার জাতীয় সাবান কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সঙ্গে স্বদেশি ব্যাংক, জীবনবিমা প্রভৃতির ক্ষেত্রেও বেশ উৎসাহ দেখা যায়।
প্রশ্ন: (১৫) ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের জনক কাকে বলা হয় ? মহারাষ্ট্রের বিপ্লবী আন্দোলনে আর্যবান্ধব সমাজ ও অভিনব ভারতের ভূমিকা আলোচনা করো ।
উত্তর:- ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের জনক ছিলেন বাসুদেব বলবন্ত ফাদকে।
মহারাষ্ট্রের বিপ্লবী আন্দোলনে আর্যবান্ধব সমাজের ভূমিকা:
বিংশ শতকের প্রথম ভাগে মহারাষ্ট্রে বিপ্লবী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একাধিক বিপ্লবী সংগঠন গড়ে ওঠে যাদের মধ্যে আর্যবান্ধব সমাজ অন্যতম । এই সংস্থার লক্ষ ছিল সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ব্রিটিশ শক্তিকে উৎখাত করা । ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে আর্যবান্ধব সমাজ সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের প্ররোচিত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় । কিছুদিনের মধ্যেই মহারাষ্ট্রের লোকমান্য তিলক এবং পাঞ্জাবের লালা লাজপত রায় ও ভাই পরমানন্দ আর্যবান্ধব সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। বাংলার বিপ্লবীরাও আর্যবান্ধব সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন ।
মহারাষ্ট্রের বিপ্লবী আন্দোলনে অভিনব ভারতের ভূমিকা:
মহারাষ্ট্রের অন্যতম বিশিষ্ট বিপ্লবী ছিলেন গণেশ সাভারকর এবং তাঁর ভাই বিনায়ক দামোদর সাভারকর। ১৯০৪ সালে গণেশ সাভারকর অভিনব ভারত নামে একটি বিপ্লবী সংস্থা গঠন করেন। মহারাষ্ট্র তথা পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সমিতির শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় । আচার্য কৃপালনি এবং বি.জে. খের এই সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১) এই সংস্থা শরীরচর্চা, লাঠি ও তরবারি খেলা, পাহাড়ে ওঠা, ঘোড়ায় চড়া প্রভৃতি দুঃসাহসিক কাজকর্মের শিক্ষা দিত ।
২) বোম্বাই ও পুণার প্রতিটি কলেজে এই সংস্থার গোপন শাখা স্থাপিত হয়। বিভিন্ন কলেজের ছাত্রদের মধ্যে বৈপ্লবিক আদর্শ ও চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেওয়া ছিল এই সমিতির প্রধান কাজ ।
৩) অস্ত্র সংগ্রহ ছিল সংঘের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি । ইতিমধ্যে বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য গণেশ সাভারকর পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ।
৪) পরবর্তীকালে এই সমিতির সদস্যরা নাসিকের ম্যাজিস্ট্রেট জ্যাকসনকে হত্যা করে । এই উপলক্ষ্যে ‘নাসিক ষড়যন্ত্র মামলায়’ বিপ্লবীদের অভিযুক্ত করা হয় ।
******
- 710 views