চতুর্থ অধ্যায়-উনিশ শতকের ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ
প্রশ্ন:- (১) ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারে চার্লস উডের প্রতিবেদনে কী কী সুপারিশ করা হয়েছিল ?
উত্তর:- শিক্ষা সংক্রান্ত নানা সমস্যার সমাধান করার জন্য ১৮৫৪ আলে চার্লস উডের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয় । এই কমিশনের সুপারিশগুলি ছিল-
১) শিক্ষার প্রসারের জন্য একটি পৃথক শিক্ষা দপ্তর গঠন করা ।
২) প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতে (কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই) একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা।
৩) সরকারি মডেল স্কুলগুলোর সংখ্যাবৃদ্ধি করা।
৪) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও নারীশিক্ষার প্রসারের ব্যাপারে জোর দেওয়া।
৫) প্রাথমিক শিক্ষাবিস্তারেরে জন্য দেশীয় বিদ্যালয়গুলোর উন্নতিসাধন করা এবং
৬) শিক্ষকদের প্রশিক্ষন দেওয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করা।
প্রশ্ন:- (২) উনিশ শতকের সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য কী ছিল ? কে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন ? ব্রাহ্মসমাজের সমাজ-সংস্কারের লক্ষ্য কী ছিল ?
উত্তর:- উনিশ শতকের সমাজ-সংস্কার আন্দোলনগুলির প্রধান লক্ষ্য ছিল-
১) যুক্তিবাদী চিন্তাধারা দ্বারা সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও কুপ্রথার অবসান ঘটানো,
২) নারী কল্যাণ এবং
৩) সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটানো ।
রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন ।
ব্রাহ্মসমাজের সমাজ-সংস্কারের লক্ষ্য:-
১) সমাজসংস্কারের মধ্য দিয়ে ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে গতিশীল করে তোলা ।
২) পর্দাপ্রথার বিলুপ্তিসাধন, বিধবা-বিবাহের আইনসিদ্ধকরণ, বহুবিবাহ প্রথার নিষিদ্ধকরণ, নারীজাতির মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রচলন প্রভৃতি নারীকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ভারতীয় নারীদের সামাজিক অবস্থানের সামগ্রিক উন্নতিসাধন।
৩) সমাজসেবা ও জনসেবামূলক কাজের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতিষ্ঠা।
৪) উদারনৈতিক ধর্মীয় আদর্শ প্রচারের মাধ্যমে জাতীয়-সংহতির পথ রচনা।
প্রশ্ন:- (৫) প্রার্থনা সমাজের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন ? জ্যোতিবা ফুলে কেন স্মরণীয় ? উনিশ শতকের সমাজ-সংস্কার আন্দোলনগুলি সমাজে কী প্রভাব বিস্তার করে ?
উত্তর:- প্রার্থনা সমাজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ডঃ আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ।
উনিশ শতকে মহারাষ্ট্রের সমাজসংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত হিসাবে জ্যোতিবা ফুলেকে মনে রাখা হয় । তিনি জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ এবং নিম্নবর্গের মানুষের অবস্থার উন্নতির জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন । পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিশেষত নারী শিক্ষার বিস্তারেও তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন ।
উনবিংশ শতকে ভারতে যে ধর্মীয় এবং সামাজিক পুনরুজ্জীবন আন্দোলন শুরু হয় তা ভারতীয় সমাজে বহুবিধ প্রভাব বিস্তার করে, যেমন-
১) ভারতবাসীরা তাদের সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে ক্রমশ সজাগ হয়ে ওঠে ।
২) ভারতবাসীরা তাদের প্রাচীন ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে ।
৩) ভারতীয় নবজাগরণ ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার বিকাশে নানা ভাবে সাহায্য করেছিল ।
৪) ভারতীয় জাতীয়তাবাদ প্রথমে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিকশিত হয়েছিল, পরে উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তা রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করে।
প্রশ্ন:- (৬) সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের একজন প্রতিষ্ঠাতার নাম করো । ইয়ং বেঙ্গল কাদের বলা হয় ? বাংলায় সমাজ-সংস্কার ও শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কার্যাবলি উল্লেখ করো ।
উত্তর:- সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের একজন প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী ।
উনিশ শতকের প্রথম ভাগে হিন্দু কলেজের অধ্যাপক হেনরি ভিভিয়ান ডিরোজিও-র ছাত্র ও অনুগামীদের ইয়াং বেঙ্গল বলা হত।
১) সমাজ-সংস্কারে বিদ্যাসাগরের অবদান:- বাংলার সংস্কার আন্দোলন, বিশেষত নারীকল্যাণের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান চিরস্বীকার্য । উনিশ শতকের নবজাগরণ ছিল তাঁর সমাজ-সংস্কার ও শিক্ষা প্রসার আন্দোলনের সার্থক পরিণতি ।
♦ পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কার্যকলাপ বাংলা তথা ভারতের সমাজ-সংস্কার আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে। বাল্য বিবাহ নিবারণ ও বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণীয়। তাঁর প্রচেষ্টায় গভর্নর-জেনারেল লর্ড ডালহৌসি ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে এক আইন প্রণয়ন করে বিধবা-বিবাহকে আইন সিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। এছাড়া প্রধানত বিদ্যাসাগরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৮৬০ খ্রিটাব্দে সরকারি আইন প্রণয়ন করে কন্যার বিবাহের বয়স সর্বনিম্ন দশ বছর নির্ধারিত করা হয়।
♦ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজ-সংস্কারের সঙ্গে ধর্মকে সংযুক্ত না করে মানবতাবাদের ওপর ভিত্তি করে একান্ত নিজস্ব উদ্যোগে সমাজ-সংস্কার আন্দোলনে ব্রতী হন। বিদ্যাসাগর ছিলেন একক সংগ্রামী— তিনি কোনো গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজ-সংস্কার আন্দোলনে প্রয়াসী হননি । রামমোহনের মতো ব্রাহ্মসমাজ অথবা ডিরোজিও -র নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর মতো কোনো প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তোলেননি।
২) শিক্ষা প্রসারে বিদ্যাসাগরের অবদান:-
(ক) শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না, কারণ তিনি বুঝেছিলেন, নারী জাতি অনগ্রসর ও কুসংস্কারচ্ছন্ন হয়ে থাকলে সমাজ পিছিয়ে থাকবে।
(খ) স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তিনি রামগোপাল ঘোষ, রাধাকান্ত দেব প্রমুখ ব্যক্তিদের সাহায্য ও সহযোগিতা পান। বিদ্যালয় পরিদর্শকের সরকারি পদে থাকার সুবাদে তিনি ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় এবং ১০০ টি বাংলা স্কুল স্থাপন করেন। এক্ষেত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল ১৮৪৯ সালে বেথুন সাহেবের সহযোগিতায় ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ স্থাপন । সংস্কৃত-শিক্ষার প্রসারের জন্য তিনি সংস্কৃত কলেজে অ-ব্রাহ্মণ শ্রেণির ছাত্রদের ভর্তির ব্যবস্থা করেন।
(গ) গণশিক্ষার প্রসারের জন্য বিদ্যাসাগর মাতৃভাষায় পঠনপাঠনের গুরুত্ব অনুভব করেন। এই জন্য তিনি সহজ-সরল পাঠ্যপুস্তক রচনায় আগ্রহী হন । শিক্ষাবিস্তারের জন্য তিনি বোধোদয়, বর্ণপরিচয়, কথামালা, শকুন্তলা, সীতার বনবাস, ভ্রান্তিবিলাস প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন।
***
- 3052 views