রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিষ্ঠা

Submitted by administrator on Mon, 04/23/2012 - 08:02

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিষ্ঠা [Growth of Political Association in India]:- ভারতে জাতীয়তাবোধের উন্মেষের পরবর্তী পদক্ষেপ হল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রতিষ্ঠা । জাতীয়তাবোধের স্ফুরণকে যথাযত বাস্তবায়িত করার জন্য ও তাকে যথাযত পথে চালনা করার জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক মঞ্চ দরকার । তাই উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকেই ভারতবর্ষে একাধিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা হয় । ডঃ অনিল শীলের মতে এই শতাব্দী হল সভা-সমিতির যুগ । এই ব্যাপারে প্রথম উদ্যোগী হন রাজা রামমোহন রায় । তাঁর সময়ে জাতীয় চেতনা সঠিক রূপ পরিগ্রহ না করলেও তিনিই প্রথম এদেশে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা করেন । রাজা রামমোহন রায়ই প্রথম ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে সংবাদপত্র আইনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভারতবাসীর অভাব অভিযোগ তুলে ধরে প্রতিকার চেয়েছিলেন । এ কারণেই তাঁকেই প্রথম রাজনৈতিক আন্দোলনের জনক বলা হয় । এরপর এদেশে একে একে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জন্মলাভ করতে থাকে ।

জমিদারদের সমিতি [Landholder's Society]:- ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রসন্নকুমার ঠাকুরের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জমিদারদের সমিতি । এই সমিতি মূলত জমিদারদের স্বার্থরক্ষা জন্য গঠিত হলেও তিনটি কারণে এই সমিতির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম ।

(১) নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের কাছ থেকে দাবি দাওয়া আদায়ের ব্যাপারে এই সমিতি সক্রিয় ছিল ।

(২) যেহেতু জমিদারদের সঙ্গে প্রজাদের স্বার্থ জড়িত, সেজন্য এই সমিতি উভয় শ্রেণির অধিকার আদায় করার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল ।

(৩) এই সমিতি ভারতীয়দের আশা আকাঙ্খার প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন ও উদারনৈতিক ইংরেজদের সমর্থন লাভ করেছিল । টাউন হলে আয়োজিত জমিদার সমিতির এক সমাবেশে দ্বারকানাথ ঠাকুর বলেছিলেন যে, এক সময় আসবে যখন হিন্দু কলেজের ছাত্ররা নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করার ও নিজেদের অভিযোগ নিরসন করার জন্য এক বলিষ্ঠ দেশপ্রেমিক সঙ্ঘ গড়ে তুলবে ।

বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি [Bengal British India Society]:- ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে জর্জ টম্পসন নামে উদারপন্থী ইংরজ 'বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি' গড়ে তোলেন । বাংলার যুব সম্প্রদায়কে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে জর্জ টম্পসন বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি গঠন করেন ।

ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন [British Indian Association]:- ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয় । সে সময় কুড়ি বছর অন্তর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারত শাসনের জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছ থেকে রাজকীয় অনুমতি (সনদ) নিতে হত । সনদ নেবার প্রাক্কালে ভারতের নানা সংস্থা নানা রাজনৈতিক দাবি ও প্রশাসনিক সুযোগ সুবিধা লাভের জন্য পার্লামেন্টের কাছে দরবার করেন । ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনও নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দাবি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে পেশ করেন । প্যারীচাঁদ মিত্র ও রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ নেতারা সিভিল সার্ভিস সমেত সব ধরনের সরকারি চাকরির দরজা ভারতীয়দের জন্য খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান । দ্বারকানাথ ঠাকুর সুপ্রীম কোর্ট ও মফঃস্বল আদালতে জুরি প্রথা প্রবর্তনের দাবি করেন । মিতাক্ষরা আইনের উল্লেখ করে প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমাণ করে দেখিয়ে দেন যে, ভারতে জুরিপ্রথা নতুন কোনো ব্যবস্থা নয় ।

ইন্ডিয়া লিগ [Indian League]:- ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে হিন্দু মেলার অবদানও কম নয় । এই মেলায় নানা দ্রব্যের প্রদর্শনীর সঙ্গে দেশাত্মবোধক গান, জাতীয় ভাবোদ্দীপক নাটক, বক্তৃতা, আলোচনা সভার আয়োজন করা হত । প্রতিবছর এই মেলার আয়োজন হত এবং এটি মোটামুটি উনবিংশ শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত চলেছিল । একই উদ্দেশ্য নিয়ে শিশিরকুমার ঘোষ ও কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলার কয়েক জন ব্রিটিশ রাজনীতি সচেতন নেতা ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ইন্ডিয়া লিগ নামে এক সংস্থা গড়ে তোলেন । ইংল্যান্ডে প্রকাশিত সংবাদপত্র একে ভারতীয়দের রাজনৈতিক জাগরণের প্রথম ইঙ্গিত বলে অভিহিত করেছিল । ইন্ডিয়া লিগের দাবি ছিল পুরবাসীর দ্বারা পৌর প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের নির্বাচন, কারিগরি শিক্ষায়তনের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি । এছাড়া জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চার এবং ভারতীয়দের রাজনৈতিক দাবি দাওয়ার প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ ছিল এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ।

ভারত সভা [Indian Association]:- ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ২৬ শে জুলাই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ভারত সভা’ গঠন করেন । কলকাতার অ্যালবার্ট হলে এক জনসমাবেশে তিনি ভারতসভার প্রতিষ্ঠাকে ভারতীয়দের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে উল্লেখ করেন । এই সময় শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়ান । জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পূর্বে ভারতসভাই ছিল ভারতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্থা । মধ্যবিত্ত শ্রেণির গণচেতনা প্রতিফলিত করে এবং বাংলার শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের কেন্দ্র হয়ে ওঠে ভারতসভা ভারতবাসীর যথার্থ প্রয়োজন মেটায় । অল্পদিনের মধ্যেই ভারত সভা উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব দেখায় । সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসার বয়সসীমা ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করার সরকারি অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ভারতসভা আন্দোলন গড়ে তোলে । সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সারা ভারতে বক্তৃতা করে জনমত সংগঠিত করেন এবং এর ফলে সরকারি সিধান্ত পরিবর্তিত হয় ও বয়সসীমা ২১ বছর বহাল থাকে । ভারতসভার নেতৃত্বে দেশীয় সংবাদপত্র আইন ও অস্ত্র আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত হয় এবং লর্ড লিটনের পরবর্তী লর্ড রিপনের আমলে ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে দেশীয় সংবাদপত্র আইন ও অস্ত্র আইন দুটি প্রত্যাহৃত হয় । ১৮৮৩-৮৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতসভার পরিচালনায় ইলবার্ট বিল আন্দোলন শুরু হয় ।

‘ভারতসভা’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য [Political Objectives of Establishment of Indian Association]:-

১) ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শাখা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সর্বভারতীয় গণ আন্দোলন গড়ে তোলা ।

২) ভারতবাসীর রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে জাতি, ধর্ম ও বিভিন্ন গোষ্ঠিকে সঙ্ঘবদ্ধ করা ।

৩) হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ঐক্য অক্ষুন্ন রাখা ।

৪) বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের উন্মেষের প্রচেষ্টা করা ।

৫) ব্রিটিশ সরকারের শোষণ নীতি এবং সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন, অস্ত্র আইন, আমদানি ও শুল্ক আইন প্রভৃতি পক্ষপাতমূলক আইনের প্রতিবাদ করা ।

***

Related Items