প্রশ্ন:- (১) ভারতের সংবিধানের চারটি মূল বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো । ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষের নাম কী ? এই সভায় কে সভাপতিত্ব করেন ?
উত্তর:- ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারি ভারতের সংবিধান প্রকাশ করা হয় । ভারতীয় সংবিধানের চারটি উল্লেখযোগ্য প্রধান বৈশিষ্ট্য হল-
ক) বিশ্বের দীর্ঘতম ও জটিলতম সংবিধান:- ভারতের সংবিধান পৃথিবীর দীর্ঘতম, জটিলতম ও লিখিত সংবিধান । মোট ৪০৫ টি ধারা, বহু উপধারা এবং ১০টি তফশিল নিয়ে সংবিধান রচিত হয়েছে ।
খ) মৌলিক অধিকার:- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অনুকরণে ভারতীয় সংবিধানে দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে । এই অধিকারগুলি হল -(ক) সাম্যের অধিকার, (খ) স্বাধীনতার অধিকার, (গ) শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, (ঘ) ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, (ঙ) শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে অধিকার, (চ্) সাংবিধানিক প্রতিকারের অধিকার ।
গ) এক-নাগরিকত্ব:- ভারতীয়দের এক নাগরিকত্বের (Single Citizenship) অধিকার স্বীকৃত হয়েছে । এক নাগরিকত্ব অর্থে সমস্ত ভারতবাসী ভারতের নাগরিক- আলাদা করে তারা কোনো অঙ্গরাজ্যের নাগরিক নয়।
ঘ) ধর্মনিরপেক্ষতা:- সংবিধানে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State) হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে । কোনো বিশেষ ধর্মকে ভারতের রাষ্ট্রীয় ধর্ম (State Religion) হিসেবে স্বীকার করা হয়নি ।
ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষের নাম হল রাজ্যসভা । আর এই রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন উপ-রাষ্ট্রপতি ।
প্রশ্ন:- (২) ভারতের রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থীর যোগ্যতা কী ?
উত্তর:-
ক) তাঁকে অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে ।
খ) তাঁর বয়স অন্তত ৩৫ বছর বা তার বেশি হতে হবে ।
গ) প্রার্থী হওয়ার সময় তিনি সংসদ বা রাজ্যবিধান সভার সদস্য অথবা কোনও সরকারি বা বেসরকারি পদে অথবা অর্থ প্রাপ্তি হয় এমন কোনোও পদে নিযুক্ত থাকতে পারবেন না ।
ঘ) তাঁকে লোকসভায় নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হবে ।
প্রশ্ন:- (৩) সংবিধান সভা কাকে বলা হয় ? সংবিধান সভার প্রথম অধিবেশন কবে এবং কোথায় বসেছিল ? কী লক্ষ্য নিয়ে এই সংস্থা ভারতের সংবিধান রচনায় প্রয়াসী হয়েছিলেন ?
উত্তর:- ভারত স্বাধীন হওয়ার আগেই ক্যাবিনেট কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে দেশের জনগণের মধ্যে থেকে কয়েজনকে প্রতিনিধি হিসাবে নিয়ে একটি সংস্থা গঠিত হয়। এই সংস্থা দেশ ও দেশের জনগণের জন্য একটি সংবিধান প্রনয়ন করে। এই সংস্থাটি গণপরিষদ বা সংবিধান সভা নামে পরিচিত ।
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর নতুন দিল্লীর ‘কনস্টিটিউশন হলে’ ড: রাজেন্দ্রপ্রাসাদের সভাপতিত্বে সংবিধান সভার প্রথম অধিবেশন বসে।
ভারতের সংবিধান সভা বা গণপরিষদের প্রধান লক্ষ্য:-
১) স্বাধীন ভারতের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর রূপরেখা অঙ্কন করা।
২) সামাজিক বিপ্লবের কাজকে সম্পূর্ণ করা ।
৩) প্রতিটি ভারতবাসীকে তার নৈপুণ্য অনুযায়ী আত্মবিশ্বাসের জন্য সর্বাধিক সুযোগ প্রদান করা ।
প্রশ্ন:- (৪) সংবিধানে কীভাবে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে ? কী কারণে ভারতীয় সংবিধানকে যুক্তরাষ্ট্রীয় বলে মনে হয় ?
উত্তর:- ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ৪২তম সংবিধান সংশোধনে মূল সংবিধানে সমাজতান্ত্রিক কথাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে । এই উদ্দেশ্যে ব্যাঙ্ক, বিমা প্রভৃতি জাতীয়করণ, রাজন্য ভাতার বিলোপসাধন, জমিদারি প্রথা বিলোপ, জমির মালিকানার ঊর্ধ্বসীমা স্থিরীকরণ, ধনীদের ওপর বিভিন্ন কর কাঠামো প্রভৃতি শাসনতান্ত্রিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ভারতের সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে প্রতিফলিত করা হয়েছে ।
ভারতের সংবিধানে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র বলে অভিহিত করা হয়নি । কিন্তু নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলির জন্য ভারতীয় সংবিধানকে যুক্তরাষ্ট্রীয় বলে মনে হয়, যেমন-
১) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হল লিখিত ও অপরিবর্তনীয় সংবিধান । ভারতের সংবিধান লিখিত এবং আংশিক ভাবে অপরিবর্তনীয় ।
২) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় সরকার ও কতগুলি আঞ্চলিক সরকার পাশাপাশি অবস্থান কারে । ভারতের ক্ষেত্রে একটী কেন্দ্রীয় সরকার ও ২৮টি রাজ্য সরকার এই দুই ধরণের সরকার নিয়েই ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠিত ।
৩) যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হল সংবিধানের প্রাধান্য, ভারত রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতীয় সংবিধানের প্রাধান্য স্বীকৃত হয়েছে ।
৪) ভারতীয় শাসনব্যবস্থার অপর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল একটি নিরপেক্ষ যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত । ভারতেও সংবিধান অনুসারে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে । এই আদালত হল সুপ্রিমকোর্ট ।
ভারতকে একটি যুক্তরাষ্ট্র বলে মনে করা হলেও:- ১) আইন প্রণয়ন, ২) শাসন পরিচালনা, ৩) আর্থিক বিষয়, ৪) রাজ্যের নাম, সীমানা ইত্যাদির পরিবর্তন, ৫) উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ (I.A.S, I.P.S প্রভৃতি) ৬) অর্ডিনান্স জারি, ৭) রাজ্যে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী প্রেরণ, ৮) জরুরি অবস্থা ঘোষণা প্রভৃতি বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ভারতীয় শাসনব্যবস্থা আকৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রীয় হলেও প্রকৃতিগতভাবে এককেন্দ্রিক। অন্যভাবে বলা যায় ভারতীয় সংবিধান হল আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধান ।
প্রশ্ন:- (৫) ভারতের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো । এই অধিকারগুলি অবাধ না শর্তসাপেক্ষ ?
উত্তর:- ভারতের সংবিধানের তৃতীয় অংশে ১২ থেকে ৩৫ নম্বর ধারায় নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি উল্লেখ করা হয়েছে । মূল ভারতীয় সংবিধানে সাত প্রকারের মৌলিক অধিকারের উল্লেখ থাকলেও ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে । বর্তমানে মৌলিক অধিকার ৬টি, যথা—
১) সাম্যের অধিকার,
২) স্বাধীনতার অধিকার,
৩) শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার,
৪) ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার,
৫) সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক অধিকার
৬) সাংবিধানিক প্রতিকারের অধিকার ।
কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কোনো আইন ভারতের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি ক্ষুণ্ণ করতে পারে না, এই বৈশিষ্ট্য বিশ্বের খুব কম সংবিধানেই পরিলক্ষিত হয় । ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকারগুলি লিখিত ভাবে স্বীকৃতিদানের ফলে নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা লাভ করেছে । এই অধিকারগুলির মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিকদের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে । সরকারের কোনও আইন এই অধিকারগুলিকে ক্ষুন্ন করতে পারে না।
ভারতের সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারগুলি অবাধ নয় । জাতির বৃহত্তর স্বার্থে অধিকারগুলির ওপর যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যেমন
১) রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানো,
২) আদালত অবমাননা,
৩) অশালীনতা প্রভৃতি ঘটনা ঘটলে ভারতের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা যায় ।
৪) বিশেষ পরিস্থিতিতে ভারতরাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলিকে সাময়িক ভাবে নিয়ন্ত্রিত বা খর্ব করতে পারে । ৫) দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলে ভারতের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলিকে খর্ব করা যায় ।
প্রশ্ন:- (৬) ভারতের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর দুটি যোগ্যতা উল্লেখ করো । ভারতের সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা আলোচনা করো ।
উত্তর:- ভারতের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর দুটি যোগ্যতা হল-
১) তিনি অবশ্যই ভারতের নাগরিক হবেন ।
২) তাঁর বয়স অন্তত ৩৫ বছর বা তার বেশি হতে হবে ।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা:-
ভারতের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে ছয় ধরনের ক্ষমতার অধিকার প্রদান করেছে । এগুলি হল-
১) শাসন সংক্রান্ত ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় মন্ত্রীপরিষদ রাষ্ট্র শাসন পরিচালনা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ও সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতিকে জানাতে বাধ্য থাকেন । ভারতের এটর্নি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নিয়োগ ও পদচ্যুত করার অধিকার রাষ্ট্রপতির রয়েছে । এছাড়া তিনি সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি, অডিটর জেনারেল, নির্বাচন কমিশনার, সশস্ত্র বাহিনীত্রয়ের তিনি প্রধান এবং ইউনিয়ন পাব্লিক সার্ভিস কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ করেন । ভারতের রাষ্ট্রপতি তার পদাধিকার বলে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীত্রয়ের সর্বাধিনায়ক ।
২) আইন সংক্রান্ত ক্ষমতা: সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের রীতি অনুসারে প্রজাতান্ত্রের রীতি অনুসারে রাষ্ট্রপতি হলেন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বিভাগ বা সংসদের একটি অংশ । রাষ্ট্রপতির সম্মতি ছাড়া কোনো বিল আইনে পরিণত হতে পারে না । অর্থবিল (money bill) ছাড়া অন্য যে-কোনো বিলকে পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদের উভয় পরিষদে ফেরত পাঠাতে পারেন ।
৩) অর্থ সংক্রান্ত ক্ষমতা: রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়া ব্যয়-মঞ্জুরি সংক্রান্ত কোনও বিল সংসদে উত্থাপন করা যায় না । রাষ্ট্রপতির আয়ব্যয় সংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে একটি বিবৃত সাধারণত অর্থমন্ত্রীর মারফত, সংসদের উভয় সভায় পেশ করান, এই বিবৃতিকেই কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট বলা হয় । এছাড়া রাষ্ট্রপতির হাতে রাষ্ট্রের আকস্মিক ব্যয় সংকুলানের জন্য একটি বিশেষ তহবিল থাকে ।
৪) বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা: বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া দন্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা করার বা তার দন্ডাদেশ হ্রাস করার অথবা দন্ডাদেশ স্থগিত রাখার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির আছে ।
৫) জরুরি ক্ষমতা: ভারতের সংবিধান অনুসারে তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন, একে রাষ্ট্রপতির জরুরি ক্ষমতা বলে, যেমন—
(ক) জাতীয় জরুরি অবস্থা (যুদ্ধ, বৈদেশিক আক্রমবণ ও নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে),
(খ) রাজ্যগুলিতে শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থাজনিত জরুরি অবস্থা (রাষ্ট্রপতি শাসন) এবং আর্থিক জরুরি অবস্থা (সমগ্র দেশ বা দেশের কোনো অংশের আর্থিক স্থায়িত্ব ও সুনাম এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়) ।
৬) রাজ্য সংক্রান্ত ক্ষমতা: রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন রাজ্যের রাজ্যপালদের নিয়োগ কারে থাকেন । রাজ্যের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় বিধান সভায় পেশ করার আগে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন হয় ।
****
- 3151 views