অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[সপ্তম অধ্যায়- ২য় অংশ]

Submitted by administrator on Mon, 04/23/2012 - 22:49

প্রশ্ন:- (৬) হিটলার কীভাবে পররাজ্য গ্রাস শুরু করে ছিলেন ? হিটলারের আক্রমণ প্রতিহত না করে পশ্চিমী গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি কোন নীতি গ্রহণ করে ছিলেন এবং কেন ? এর ফলা ফল কী হয়েছিল ?

উত্তর:- ইউরোপ তথা সারা বিশ্বে জার্মানিকে প্রধান শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হিটলার পররাজ্য গ্রাস বা বিস্তার নীতি অবলম্বন করে । বিস্তারধর্মী পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গ হিসাবে ভার্সাই সন্ধির শর্ত উপেক্ষা করে তিনি জার্মানির সামরিক শক্তিকে শক্তিশালী করেন এবং ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনের সঙ্গে নৌ-চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে হিটলার ইতালির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং পরের বছর লোকার্নো চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে রাইন অঞ্চলে সৈন্য পাঠান । এইভাবে হিটলার পররাজ্য গ্রাস শুরু করেন ।

হিটলারের আক্রমণ প্রতিহত না করে পশ্চিমী গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি তোষণ নীতি গ্রহণ করে ছিলেন কারণ :-

(১) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সামরিক শক্তিতে প্রস্তুত ছিল না ,

(২) ব্রিটেনের অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা কারণ নাৎসি জার্মানি ছিল ব্রিটিশ বাণিজ্য পণ্যের অন্যতম ক্রেতা ,

(৩) ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের রুশ সাম্রাজ্যবাদ ভীতি ।

প্রভৃতি কারণে হিটলারের আক্রমণ প্রতিহত না করে নাৎসি জার্মানির প্রতি ব্রিটেন ও ফ্রান্স তোষণ নীতি গ্রহণ করেছিল ।

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তোষণ নীতি গ্রহন করায় নাৎসি জার্মানি শক্তিশালী হয়ে ওঠে । হিটলার আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তিনি রাইন ভূখন্ড, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া প্রভৃতি দেশ গুলিকে একের পর এক আক্রমণ করে দখল করে নেন । অবশেষে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাদের তোষণ নীতির পরিবর্তন ঘটিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় । এই কারণেই ঐতিহাসিকরা হিটলারের প্রতি ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষের তোষণ নীতিকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য দায়ী করেছেন।

প্রশ্ন:- (৭) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে কী কী কারণে ইউরোপীয় দেশগুলির গণতন্ত্রের পতন ঘটে ?

উত্তর:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম প্রভৃতি ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলি জয়ী হয় । তখন মনে হয়ে ছিল যে, ইউরোপীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটবে । যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে পরাজিত দেশগুলি , যেমন জার্মানি ও ইতালিতে গণতান্ত্রিক সংবিধান রচিত হয় । কিন্তু দুই বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালে (ক) গণতন্ত্রের মড়ক, (খ) নবপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলির দুর্বলতা, (গ) গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অভাব, (ঘ) দুরদর্শী জনপ্রিয় রাষ্ট্র নায়কের অভাব, (ঙ) অর্থনৈতিক মন্দার আঘাত, (চ) জাতিসংঘের ব্যর্থতা প্রভৃতি কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইউরোপ গণতন্ত্রের পতন ঘটে ।

প্রশ্ন:- (৮) কত খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় ? কোন্‌ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং কবে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয় ?

উত্তর:- প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পরবর্তী কালে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জাতি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়।

জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে তার দু’দিন পরে, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩রা সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাদের পূর্ব ঘোষণা অনুসারে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, এইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

প্রশ্ন:- (৯) ফ্রাঙ্কো কে ? স্পেনে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল কেন ? এই গৃহ যুদ্ধের গুরুত্ব কী ?

উত্তর:- স্পেনের গৃহযুদ্ধের অন্যতম নেতা ছিলেন জেনারেল ফ্রাঙ্কো । তিনি স্পেনের প্রজাতন্ত্রী সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

স্পেনের গৃহযুদ্ধের কারণ:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে স্পেনের রাজতন্ত্রী, প্রজাতন্ত্রী, সমাজতন্ত্রী প্রভৃতি দলগুলি রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য স্পেনে যে গৃহ যুদ্ধ শুরু করে তা ‘স্পেনের গৃহযুদ্ধ’ নামে পরিচিত ।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ যে কেবল স্পেনের ভিতরেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এর বিশেষ গুরুত্ব ছিল, যেমন-

(ক) হিটলার ও মুসোলিনির শক্তি বৃদ্ধি:- ফ্রাঙ্কোর অধিনায়কত্বে স্পেনে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে হিটলার-মুসোলিনি জোটের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি পায় ।

(খ) ফ্যাসিবাদি শক্তির জয়:- স্পেনে গণতান্ত্রিক সরকারের পরাজয়ের মাধ্যমে আদর্শগত দ্বন্দ্বে গণতন্ত্র সাময়িকভাবে পশ্চাদপসরণ করে এবং ফ্যাসিবাদী শক্তি জয়যুক্ত হয় ।

(গ) ব্রিটেন ও ফ্রান্সের রুশভীতি ও ফ্যাসিস্ট তোষণ নীতি গ্রহণ:- স্পেনের গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকারের হিটলার ও মুসোলিনিকে তোষণ করবার নীতি অত্যন্ত ঘৃণ্যভাবে ভাবে প্রকটিত হয় ।

(ঘ) জার্মানির লাভ:- স্পেনের গৃহযুদ্ধের ফলে সবচেয়ে লাভবান হয় জার্মানি, কারণ-

(১) স্পেনের গৃহযুদ্ধের ফলে একদিকে যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরাজয় ঘটে, অন্যদিকে স্পেনে ইতালির ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে হিটলার দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে জার্মানির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়ে যান।

(২) স্পেনের গৃহযুদ্ধের মধ্যদিয়ে হিটলার তাঁর স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর দক্ষতা এবং বিভিন্ন মারণাস্ত্রের ক্ষমতা যাচাই করার সুযোগ পান । সেই অনুসারে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপযোগী অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করার দিকে মন দেন ।

স্পেনের গৃহযুদ্ধের সমস্ত দিক বিচারবিবেচনা করে একথা বলা যায় যে, এই গৃহযুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি মহড়া (Stage rehearsal of the Second World War) বিশেষ ।

প্রশ্ন:- (১০) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ আলোচনা করো ।

উত্তর:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরাট ধ্বংসকার্য শেষ হওয়ার মাত্র একুশ বছরের মধ্যেই বিশ্ববাসী আর একটি বিধ্বংসী যুদ্ধের মুখোমুখি হয় । বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই কোনো না কোনো ভাবে এই বিশ্বযুদ্ধের দ্বারা প্রভাবিত হয় । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যাকালে ঐতিহাসিকরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলি তুলে ধরেছেন, যেমন-

(১) ভার্সাই সন্ধির কঠোরতা ও জার্মানির প্রতিশোধ স্পৃহা:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রপক্ষ পরাজিত জার্মানির ওপর বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে দেয় । সন্ধির শর্ত সম্পর্কে জার্মান প্রতিনিধিদের মতামত উপেক্ষা করে তাঁদের সন্ধিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল । সেই একতরফা চুক্তিকে জার্মানির জনগণ কোনো দিনই মেনে নেননি । ইতিমধ্যে জার্মানি ভিতরে ভিতরে সামরিক শক্তিকে সুসজ্জিত করে তোলে । জার্মানির জনগণের সেই জনরোষকে কাজে লাগিয়ে তাই মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যেই অ্যাড্‌ল্‌ফ্‌ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি জার্মানি ভার্সাই সন্ধির সমস্ত অপমানজনক চুক্তি ভেঙে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় । অর্থাৎ ভার্সাই সন্ধির কঠোরতার মধ্যে আর একটি বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল ।

(২) জাতি সংঘের ব্যর্থতা:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান এবং সেই সঙ্গে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য লিগ্‌ অফ্‌ নেশনস্‌ বা জাতি সংঘের প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু জাতিসংঘের ব্যর্থতার জন্যই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটে এবং ফ্যাসিবাদী ও ন্যৎসিবাদী একনায়কতন্ত্রের উত্থান হয়, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ববাসী আরও একটি ভয়াবহ ও নৃশংস বিশ্বযুদ্ধের সম্মুখীন হয় । জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারণ গুলি ছিল-

(ক) সাংগাঠনিক ত্রুটি,

(খ) নিজস্ব সেনাবাহিনীর অভাব,

(গ) বৃহৎ শক্তিবর্গের অনুপস্থিতি,

(ঘ) নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থতা,

(ঙ) সদস্য রাষ্ট্রের ভিটো প্রয়োগ প্রভৃতি ।

এইভাবে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্ব পালনে লিগ অফ নেশনস ব্যর্থ হয়, যার পরিণতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবসম্ভাবী হয়ে ওঠে ।

(৩) জার্মানি, ইতালি ও জাপানের উপনিবেশ বিস্তারের অতৃপ্ত আকাঙ্খা:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকা বিশ্বের অধিকাংশ উপনিবেশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় । জার্মানি, ইতালি ও জাপানের ভাগ্যে কোনো উপনিবেশই জোটেনি । জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কাঁচামাল সংগ্রহের জন্যে এই দেশগুলি উপনিবেশ দখলের কর্মসূচি গ্রহণ করে । এই ভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, যার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনে ।

(৪) গণতন্ত্রী রাষ্ট্রগুলির মতবিরোধের সুযোগে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিস্তার:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় । দুই বৃহৎ গণতন্ত্রী রাষ্ট্রের এই মতবিরোধ ফ্যাসিবাদী শক্তির বিস্তারকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল ।


****

Related Items

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[দশম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) ঠান্ডা লড়াই কথাটি সর্বপ্রথম কে জনপ্রিয় করে তোলেন ? কোন দুটি দেশ ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ছিলেন ?

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[নবম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন কে ? এই সভার সদস্য সংখ্যা কত ? লোকসভার গঠন ও কার্যাবলি সংক্ষেপে বর্ণনা করো ।

উত্তর: রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন উপরাষ্ট্রপতি । এই রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা হল ২৫০ জন ।

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ৫ম: অংশ]

প্রশ্ন:- (২৯) দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা কে ছিলেন ? স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ দিকে এই নীতি কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অবনতি ঘটায় ?

উত্তর:- দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা ছিলেন স্যার সৈয়দ আহম্মদ খাঁ

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ৪র্থ অংশ]

প্রশ্ন:- (২২) আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার কোথায় অনুষ্ঠিত হয় ? বিচারাধীন দুই জন আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতির নাম লেখ ।

অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:[অষ্টম অধ্যায়- ২য় অংশ]

প্রশ্ন:- (৮) কীভাবে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয় ?