ক্রান্তীয় অঞ্চলে আয়নবায়ুর গতিপথে পৃথিবীর বড়ো বড়ো উষ্ণ মরুভূমিগুলো অবস্থিত কারণ কি ?
বায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুর জলীয়বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় । এই জন্য আয়নবায়ু ক্রান্তীয় অঞ্চলের শীতল স্থান থেকে প্রবাহিত হয়ে যতই নিরক্ষরেখার নিকটবর্তী উষ্ণ স্থানের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে, ততই তার উষ্ণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ততই তার জলীয়বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা বাড়তে থাকে । সেজন্য জলীয়বাষ্পহীন আয়নবায়ুর প্রভাবে ক্রান্তীয় অঞ্চলে সাধারণত বৃষ্টি পাত হয় না । এই জন্য ক্রান্তীয় অঞ্চলে আয়নবায়ুর গতিপথে পৃথিবীর বড়ো বড়ো উষ্ণ মরুভূমিগুলো অবস্থিত; যেমন:- সাহারা, থর, আটাকামা প্রভৃতি । তবে আয়নবায়ু যদি সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আসে, তবে সেখানে কিছু কিছু বৃষ্টিপাত হয় ; যেমন:- উত্তর-পূর্ব ব্রাজিল, হাওয়াই ও উত্তর-পুর্ব অস্ট্রেলিয়া ।
বায়ুচাপ কোন যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করা হয় এবং বায়ুচাপ পরিমাপের একক কী ?
ব্যারোমিটার নামক যন্ত্রের সাহায্যে বায়ুচাপ মাপা হয় । বায়ুচাপ পরিমাপের একক মিলিবার । মিলিবার হচ্ছে একটি বল, যা প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে ১,০০০ ডাইনের মান ।
[ ডাইন বলের একটি একক । ১ ডাইন প্রায় ১ মিলিগ্রাম ওজনের সমান ]
বায়ুর উষ্ণতার তারতম্যের সঙ্গে বায়ুচাপের সম্পর্ক কী ?
(১) বায়ুমন্ডলের উষ্ণতার ওপর বায়ুচাপ সম্পূর্ণ ভাবে নীর্ভরশীল।
(২) বায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে বায়ু প্রসারিত হয় এবং হালকা হয়ে যায় । হালকা বায়ুর চাপও কম হয় । এইজন্য বায়ুতে যখন উষ্ণতা বেশি হয় তখন বায়ুর চাপ কম হয় ।
(৩) একইভাবে বায়ুর উষ্ণতা হ্রাস পেলে বায়ুর ঘনত্ব বেড়ে যায় ফলে বায়ুর চাপও বৃদ্ধি পায় ।
(৪) বায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে বায়ু হালকা ও ঊর্ধ্বমুখী হয় । আবার বায়ুর উষ্ণতা কমলে বায়ু অপেক্ষাকৃত ভারী ও নিম্নমুখী হয় ।
(৫) বায়ুর উষ্ণতার সঙ্গে বায়ুর চাপ বিপরীত অনুপাতে পরিবর্তিত হয় । বায়ুর উষ্ণতা কমলে বায়ুর চাপ বাড়ে এবং উষ্ণতা কমলে বায়ুর চাপ কমে ।
উচ্চতা হ্রাসবৃদ্ধির সঙ্গে বায়ুচাপের সম্পর্ক কী ?
অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোনো স্থানের উচ্চতার সঙ্গে সেই স্থানের বায়ুচাপ ব্যস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয় । ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা বাড়লে বায়ুচাপ কমে । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রতি ১১০ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে বায়ুর চাপ ১ সেমি বা ১.৩৪ মিলিবার হারে কমে যায় ।
আবহাওয়া ও জলবায়ুর মধ্যে পার্থক্য কি ।
|
আবহাওয়া |
জলবায়ু |
|
১) কোনো নির্দিষ্ট স্থানের নির্দিষ্ট সময়ের বায়ুর উষ্ণতা, বায়ুচাপ, বায়ুপ্রবাহ, আদ্রতা, বৃষ্টিপাত, প্রভৃতি উপাদানের দৈনন্দিন অবস্থাকে আবহাওয়া বলা হয় । |
১) কোনো বিস্তৃত অঞ্চলের কমপক্ষে ৩০-৫০ বছরের আবহাওয়ার গড় অবস্থাকে জলবায়ু বলা হয় । |
|
২) আবহাওয়া হল বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরের দৈনন্দিন অবস্থা । |
২) জলবায়ু হল বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরের দীর্ঘকালীন সামগ্রিক অবস্থা । |
|
৩) আবহাওয়া কোনো স্বল্প পরিসরে সীমাবদ্ধ স্থানের বায়ুমণ্ডলের সাময়িক অবস্থা সূচিত করে । |
৩) জলবায়ু একটি বিস্তৃীর্ণ অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলের দীর্ঘকালীন গড় অবস্থা নির্দেশ করে । |
|
৪) কোনো স্থানের আবহাওয়া প্রতিদিন এমনকি প্রতি ঘন্টায়ও পরিবর্তিত হয় । |
৪) প্রতিদিনের ব্যবধানে কোনো অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তিত হয় না । |
|
৫) স্থানভেদে আবহাওয়া সহজেই পরিবর্তিত হয় । |
৫) জলবায়ুর পরিবর্তন হয় স্থানভেদে ও ঋতুভেদে । |
|
৬) আবহাওয়া হল জলবায়ুর বিভিন্নতা । |
৬) জলবায়ু হল বিভিন্ন আবহাওয়ার সমন্বয় । |
মৌসুমি বায়ু পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলে প্রবাহিত হয় ?
প্রধানত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যেমন ভারত, বাংলাদেশ, চিন, জাপান, উত্তর শ্রীলঙ্কা, কোরিয়া, ইন্দোচিন, থাইল্যান্ড, প্রভৃতি দেশে মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয় । এছাড়া উত্তর আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো, উত্তর অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি অঞ্চলেও মৌসুমি বায়ুর প্রভাব দেখা যায় ।
বায়ুচাপ বলয়ের সঙ্গে মেরুবায়ুর সম্পর্ক কী ?
১) অতিরিক্ত শৈত্যের ফলে এবং সূর্যকিরণের অভাবে বায়ুতে জলীয়বাষ্প কম থাকে বলে দুই মেরুর নিকটবর্তী অঞ্চলে বায়ুর চাপ সারা বছরই বেশি থাকে । উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের ৬৫০- ৯০০ অক্ষাংশের মধ্যে সারাবছর ধরেই বায়ুর উচ্চচাপ দেখা যায়, তাই এই দুই অঞ্চলকে মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় বলা হয় ।
২) উত্তর গোলার্ধে সুমেরুবৃত্ত এবং দক্ষিণ গোলার্ধে কুমেরুবৃত্ত অঞ্চলে সারা বছর ধরেই বায়ুর নিম্নচাপ দেখা যায়, যথাক্রমে এদের সুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় এবং কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় বলা হয় ।
৩) উত্তর গোলার্ধে মোটামুটি ভাবে ৭০০- ৮০০ অক্ষরেখার মধ্যে মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারাবছর ধরে তীব্র শীতল ও শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয়ে মেরুবায়ুর সৃষ্টি করে । উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব মেরুবায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব মেরুবায়ু প্রবাহিত হয় ।
বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে বায়ুচাপের সম্পর্ক কী ?
১) বায়ুচাপের তারতম্য হল বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ ।
২) বায়ুচাপের তারতম্যের দ্বারা বায়ুপ্রবাহের বেগ ও দিক নির্ধারিত হয় ।
৩) কোনো স্থানের বায়ু উত্তপ্ত হলে সেখানে বায়ুচাপের হ্রাস ঘটে এবং আংশিক স্থান বায়ুশূন্য হয় । এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য শীতল উচ্চচাপযুক্ত স্থান থেকে বাতাস নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয় । বায়ুচাপের পার্থক্যের মাত্রার উপর বায়ুপ্রবাহের বেগ নির্ভর করে ।
৪) বায়ুচাপের পার্থক্য বেশি হলে বায়ুপ্রবাহের বেগ বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে বায়ুচাপের পার্থক্য কমে গেলে বায়ুপ্রবাহের বেগও কমে যায় ।
স্থলবায়ু ও সমুদ্রবায়ুর মধ্যে পার্থক্য কী ?
|
স্থলবায়ু |
সমুদ্রবায়ু |
|
১) স্থলবায়ু স্থলভাগ থেকে সমুদ্র, হ্রদ অথবা বিস্তৃত জলভাগের দিকে প্রবাহিত হয় । |
১) সমুদ্রবায়ু সমুদ্র, হ্রদ বা বিস্তৃত জলভাগ থেকে স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয় । |
|
২) স্থলবায়ু সাধারণত সন্ধ্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেগে প্রবাহিত হয় । |
২) সমুদ্রবায়ু সাধারণত দিনের বেলায় প্রবাহিত হয় । |
|
৩) স্থলবায়ু মধ্যরাত্রি থেকে ভোররাত্রির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেগে প্রবাহিত হয়। |
৩) সমুদ্রবায়ু সন্ধ্যাবেলায় সবচেয়ে বেশি বেগে প্রবাহিত হয় । |
নিরক্ষীয় অঞ্চলে বায়ুর পরিচলন গতির কারণ কী ?
১) নিরক্ষরেখার উভয় পাশে ৫০- ১০০ অক্ষাংশের মধ্যে সূর্য প্রায় সারা বছর লম্বভাবে কিরণ দেয়, তাই এই অঞ্চলের বায়ু তূলনামূলকভাবে উষ্ণ ও হালকা হয় । অন্যদিকে
২) নিরক্ষীয় অঞ্চলে স্থলভাগের তুলনায় জলভাগ বেশি বলে প্রখর সূর্যকিরণের উত্তাপে এই অঞ্চলের জল বাষ্পীভূত হয়ে জলীয়বাষ্পরূপে বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকে । বিশুদ্ধ বায়ুর তুলনায় জলীয়বাষ্প হালকা বলে জলীয়বাষ্পপূর্ণ এই বায়ু হালকা হয় ।
৩) এই দুই কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলের নিম্নস্তরের জলীয়বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ ও হালকা বায়ু সোজা উপরে উঠে যায় এবং সেখানকার প্রবল শৈত্যের সংস্পর্শে এসে প্রসারিত, শীতল ও ঘনীভূত হয়ে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটায় যাকে পরিচলন বৃষ্টি বলে ।
৪) অতঃপর উপরের স্তরের শীতল ও ভারী বাতাস নীচে নামে এবং প্রখর সূর্যকিরণ ও জলভাগের প্রভাবে উষ্ণ, আর্দ্র ও হালকা হয়ে আবার ওপরে ওঠে । বায়ুর পরিচলন গতির এই প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চক্রাকারে চলতে থাকে ।
অর্থাৎ নিরক্ষীয় অঞ্চলের:-
১) জলীয়বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ ও আর্দ্রবায়ু উপরে উঠে শীতল ও প্রসারিত হয় ।
২) শীতল বায়ু ভারী বলে তা নিম্নগামী হয় ।
৩) নীচে নেমে ওই বায়ু উষ্ণ, আদ্র ও জলীয়বাষ্পপূর্ণ হলে তা আবার হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় । এইভাবে নিরক্ষীয় অঞ্চলে বায়ু চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে । উষ্ণ বায়ুর এই আরোহণ এবং অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ুর অবরোহণকে বায়ুর পরিচালন গতি বলে ।
জলবায়ু বা আবহাওয়ার উপাদান হিসাবে বায়ুচাপের গুরুত্ব কী ?
উচ্চতার সঙ্গে বায়ুচাপের পরিবর্তন জলবায়ুর ওপর প্রভাব বিস্তার করে । আবহাওয়ার উপাদান হিসাবে বায়ুচাপের যথেষ্ঠ গুরুত্ব আছে ।
১) বায়ুচাপের পার্থক্যই হল বায়ুপ্রবাহের মূল কারণ । কোনো স্থানের তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাত সেই স্থানের বায়ুপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে ।
২) বায়ু জলভাগের ওপর দিয়ে কোনো স্থানে প্রবাহিত হয়ে আসলে সেখানে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়ে । আবার বায়ু স্থলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আসলে তা শুষ্ক হয় এবং তার দ্বারা বৃষ্টিপাত হয় না । অপর দিকে
৩) শীতল অঞ্চল থেকে আসা শীতল বায়ু কোনো স্থানের উষ্ণতা কমিয়ে দেয়, আর উষ্ণ অঞ্চল থেকে আসা উষ্ণ বায়ু হঠাৎ কোনো স্থানের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয় । সুতরাং কোনো স্থানের আবহাওয়া কীরকম হবে তা নির্ধারণে বায়ুচাপের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।
বায়ুতে জলীয় বাষ্পের তারতম্যের সঙ্গে বায়ুচাপের সম্পর্ক কী ?
জলীয়বাষ্প বিশুদ্ধ বায়ুর তুলনায় হালকা হওয়ায় জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ুও হালকা হয়, ফলে জলীয় বাষ্পপূর্ণ আর্দ্র বায়ুর চাপও হয় কম । তুলনায় শুকনো বায়ু ভারী হওয়ায় শুকনো বায়ুর চাপ বেশি । এইজন্য বর্ষাকালে বায়ুরচাপ কম এবং শীতকালে বায়ুচাপ বেশি হয় ।
***
- 5578 views