প্রশ্ন:- (৮) রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন কে ? এই সভার সদস্য সংখ্যা কত ? লোকসভার গঠন ও কার্যাবলি সংক্ষেপে বর্ণনা করো ।
উত্তর: রাজ্যসভার সভাপতিত্ব করেন উপরাষ্ট্রপতি । এই রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা হল ২৫০ জন ।
লোকসভার গঠন-
১) লোকসভার সদস্যগণ ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রাপ্তবয়ষ্কদের ভোটে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
২) বর্তমানে লোকসভার মোট সদস্যসংখ্যা ৫৪৫ জন । এর মধ্যে ৫৩০ জন সদস্য ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে এবং ১৩ জন সদস্য ভারতের কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলগুলি থেকে জনসাধারণের প্রত্যক্ষ ভোটে সরাসরি ভাবে নির্বাচিত হন। কেবলমাত্র ২ জন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সদস্যকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত করেন।
৩) ২৫ বছর বয়সি যেকোনো ভারতীয় নাগরিক লোকসভার সদস্য হতে পারেন।
৪) সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন লোকসভার প্রথম অধিবেশনে সদস্যরা একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করেন এবং এই সভার স্থায়িত্বকাল পর্যন্ত তাঁরা সভার কাজ পরিচালনা করেন । লোকসভার সদস্যরা ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন- লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব গৃহীত হলে) রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে ৫ বছরের আগেই লোকসভা ভেঙে দিতে পারেন ।
লোকসভার কার্যাবলী:
১) যেকোনো বিল বা আইন-ঘটিত প্রস্তাব লোকসভায় ও রাজ্যসভায় অনুমোদন করাতে হয়।
২) অর্থসংক্রান্ত বিল কেবলমাত্র লোকসভাতেই উত্থাপন ও পাশ করাতে হয় ।
৩) সংসদে গৃহীত বিল আইনে পরিণত করতে হলে রাষ্ট্রপতির লিখিত সন্মতির প্রয়োজন হয় । রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে অর্থবিল ছাড়া অন্যান্য বিল পুনর্বিবেচনার জন্য আবার সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন, কিন্তু অর্থবিল একবার লোকসভায় পাশ হলে রাষ্ট্রপতি তা পুনর্বিবেচনার জন্য আর সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন না।
প্রশ্ন:- (৯) ভারতীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো । স্বাধীন ভারতে গণতন্ত্রের বিকাশ সংক্ষেপে লেখো ।
উত্তর:- স্বাধীন ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বলে অভিহিত করা হয়েছে । ভারতের গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে । এই ভিত্তির প্রথম পর্বে আছেন রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা, দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আইনসভা এবং সুপ্রিমকোর্ট । অন্যদিকে রাজ্যগুলিতে রাজ্যপাল, মন্ত্রীসভা, আইনভা, হাইকোর্ট ও অন্যান্য নিম্নতর আদালতকে কেন্দ্র করে এই প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে।
স্বাধীন ভারতের গণতন্ত্রের বিকাশ:
১) স্বাধীন ভারতের সংবিধান দেশবাসীকে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেয় । কিন্তু সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক তথা ধর্ম, ভাষা, জাতিগত সমস্যা ও উদ্বাস্তু সমস্যা এত জটিল আকার ধারণ করেছিল যে, গণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ ছিল ।
২) ১৯৫১-১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ছিল নব প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সামনে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের প্রথম বৃহত্তর পরীক্ষা । ভারত যথেষ্ট কৃতিত্বের সঙ্গে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল ।
৩) ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মাঝের দু’বছর (মার্চ, ১৯৯৭ খ্রি. জুলাই ১৯৭৯ খ্রি.) ছাড়া একটানা ৩৭ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দলের একক আধিপত্য বজায় ছিল ।
৪) সাম্প্রতিক কালে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘প্রকৃতিগতভাবে মৌলিক পরিবর্তন, ঘটতে দেখা যাচ্ছে । সত্তরের দশকের শেষে ভাগ থেকে ভারতে যে ‘বহুদলীয় জোট রাজনীতির সূত্রপাত হয়েছিল, সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তা আজ প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
৫) সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ভারত হল বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ । তাছাড়া এই উপমহাদেশে ভারতই হল একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ, যার শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্ব স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আজ পর্যন্ত কখনও সামরিক বাহিনীর হস্তগত হয়নি এবং দুই একটি ব্যাতিক্রমী নজির ছাড়া জনসাধারণের মৌলিক অধিকারগুলিকে কেড়ে নেওয়া হয়নি । নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে এবং তা দিনে দিনে আরও সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠছে ।
প্রশ্ন:- (১০) ভারতে মোট কয়টি অঙ্গ রাজ্য আছে ? প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের রাজ্যপাল কে নিযুক্ত করেন ? রাজ্যপালের ক্ষমতা ও কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো ?
উত্তর:- ভারতে মোট ২৮ টি অঙ্গরাজ্য আছে। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের রাজ্যপালকে নিযুক্ত করেন রাষ্ট্রপতি।
১) রাজ্যের শাসন ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হলেন রাজ্যপাল । রাজ্যপ্রশাসনের সমস্ত ক্ষমতা তাঁর ওপর ন্যস্ত থাকে ।
২) রাজ্যপাল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যের অন্য সদস্যদেরও নিয়োগ করেন। এছাড়া রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল ও রাজ্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্যদেরও তিনি নিয়োগ করেন । রাজ্যের হাইকোর্টের বিচারপতিদের নি্যোগের সময় রাষ্ট্রপতি তার মতামত নেন ।
৩) রাজ্যের বিধানসভা রাজ্যপালকে নিয়ে গঠিত হয় । তাঁর অনুমোদন না পেলে রাজ্য বিধানসভায় গৃহীত কোনো বিলকে আইনে পরিণত করা যায় না ।
৪) রাজ্যের বিধানসভার অধিবেশন না থাকলে প্রয়োজন হলে রাজ্যপাল অর্ডিনান্স বা অস্থায়ী আইন জারি করতে পারেন যা বিধানসভার অধিবেশন শুরুর ৬ সপ্তাহের মধ্যে বিধানসভার অনুমোদন না পেলে বাতিল হয়ে যায় ।
৫) রাজ্য মন্ত্রীসভা যদি সংবিধান ভঙ্গ করে অথবা বিধানসভার সংখ্যা গরিষ্ঠতা হারালেও পদত্যাগ করতে রাজি না হয়, সেক্ষেত্রে রাজ্যপাল রাষ্ট্রপতি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে রাজ্য মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করতে পারেন ।
৬) কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজ্যপাল সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাজা মুকুব করতে বা মেয়াদ কমিয়ে দিতে পারেন, তবে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিকে ক্ষমাপ্রদর্শনের এক্তিয়ার রাজ্যপালের নেই ।
প্রশ্ন:- (১১) ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের তাৎপর্য ও জাতীয় কংগ্রেসের সাফল্য সম্পর্কে লেখো ।
উত্তর:- ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৯৫১-৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । প্রথম সাধারণ নির্বাচন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ—
১) এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতের সংবিধানে বর্ণিত সার্বভৌম অধিকার ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি বাস্তবায়িত হয়। ২) সদ্য স্বধীনতা প্রাপ্ত ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক তথা ধর্ম , ভাষা, জাতিগত ও উদ্বাস্তু সমস্যা সত্ত্বেও নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতীয় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়।
প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সাফল্য:-
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর ব্যক্তিত্ব, জনপ্রিয়তা ও ভাবমুর্তিকে সামনে রেখে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অভূতপূর্ব সাফল্যলাভ করে । এই নির্বাচনে লোকসভার ৭৫% ও রাজ্যের বিধানসভাগুলিতে ৬৮% আসনে জয়যুক্ত হয় । মাদ্রাজ, উড়িষ্যা, ত্রিবাঙ্কুর, কোচিন ও পাঞ্জাব ছাড়া সব রাজ্যেই জাতীয় কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে । এইসব রাজ্যগুলিতে কংগ্রেস অন্যান্য ছোটো দলগুলির সঙ্গে মিলিত হয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হয় ।
প্রশ্ন:- (১২) সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলী আলোচনা করো । ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ও ক্ষমতা সংক্ষেপে লেখো ।
উত্তর:- ভারতের বিচারব্যবস্থার শীর্ষে আছে সুপ্রিমকোর্ট । এই সুপ্রিমকোর্ট একাধারে যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত এবং আপিল আদালত হিসেবে কাজ করে ।
সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ও কাজ: ভারতের সুপ্রিমকোর্টের চার ধরনের ক্ষমতা রয়েছে, এগুলি হল-
১) মৌলিক বিচার ক্ষমতা (Original Jurisdiction): ভারতবর্ষের রাজ্যের সঙ্গে রাজ্যে এবং রাজ্যের সঙ্গে কেন্দ্রের বিরোধ দেখা দিলে সুপ্রিমকোর্ট তার নিষ্পত্তি করে । এছাড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সেখানে সুপ্রিমকোর্টের রায়ই চুড়ান্ত । এই জন্য সুপ্রিমকোর্টকে সংবিধানের বিশ্লেষক ও রক্ষক বলা হয় ।
২) আপিল বিচার ক্ষমতা (Aprellate Jurisdiction): এই ক্ষমতা বলে সুপ্রিমকোর্ট ভারতের বিভিন্ন হাইকোর্টের দেওয়ানি, ফৌজদারি এবং সংবিধান সংক্রান্ত বিচারের বিরুদ্ধে আপিলের বিচার করেন ।
৩) পরামর্শদানের ক্ষমতা (Advisory Jurisdiction): আইন সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ বা অভিমত জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্ট তা দিয়ে থাকেন।
৪) আদেশ, নির্দেশ বা পরওয়ানা জারি করার ক্ষমতা (Order Jurisdiction): কোনোও নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে সুপ্রিমকোর্ট আদেশ, নির্দেশ অথবা পরওয়ানা (Writ) জারি করে তা রক্ষা করার ব্যবস্থা করতে পারেন ।
প্রধান মন্ত্রীর দায়িত্ব ও ক্ষমতা:-
১) ভারত সরকারের সব ক্ষমতাই রাষ্ট্রপতির নামে পরিচালিত হলেও ভারতের প্রকৃত শাসন ক্ষমতার অধিকারী হলেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রীপরিষদ । মন্ত্রীদের মধ্যে দপ্তর বন্টন, মন্ত্রীপরিষদের কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা হল প্রদানমন্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য । কোন্ মন্ত্রী কোন্ দপ্তর পরিচালনা করবেন তা প্রধানমন্ত্রীই স্থির করেন । এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তাঁর ইচ্ছা অনুসারে যে-কোনো মন্ত্রীকে তাঁর মন্ত্রীসভা থেকে বাদ দিতে পারেন ।
২) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো মন্ত্রীর মতের মিল না হলে সেই মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয় । যদি তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করেন, সেই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং পদত্যাগ করে বর্তমান মন্ত্রীসভা ভেঙে দিয়ে নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করতে পারেন এবং নতুন মন্ত্রীসভা থেকে এই মন্ত্রীকে সহজেই বাদ দিতে পারেন । অবশ্য কোনো জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে রাজনৈতিক দিক থেকে অনেক ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তবে এই ঘটনা সাধারণত ঘটে না ।
৩) প্রধানমন্ত্রী হলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা এবং রাষ্ট্রপতির মধ্যে যোগসূত্র । ভারতীয় সংবিধান অনুসারে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে জানান এবং রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে জানাতে বাধ্য থাকেন ।
প্রশ্ন:- (১৩) ভারতের সর্বোচ্চ আদালত কোনটি ? এই আদালত বর্তমানে কত জন বিচারপতি নিয়ে গঠিত ?
উত্তর: সুপ্রিমকোর্টকে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বলা হয়। বর্তমানে এই আদালত একজন প্রধান বিচারপতি ও ২৫ জন বিচারপতি নিয়ে গঠিত ।
***
- 2069 views